আত্মপ্রত্যয়ী এক নারী উদ্যোক্তার গল্প


শিরীন দত্ত, উদ্যোক্তা, এএসকে হ্যান্ডিক্র্যাফটস লিমিটেড

বাংলাদেশের হ্যান্ডিক্রাফট রপ্তানিতে ‘এএসকে হ্যান্ডিক্রাফট লিমিটেড’ প্রথম অবস্থানে আছে। একথাটা শুনে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই হয়তো। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার একজন নারী তা শুনে কারো কারো চোখ কপালে উঠতে পারে। হ্যাঁ; শিরীন দত্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানটি। আমেরিকা, ব্রিটেন, চায়না, অস্ট্রিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে রয়েছে আমাদের হাতে তৈরি পণ্যের বিরাট বাজার। আর এই ক্ষেত্রটিতে শিরীনের আছে জনপ্রিয় ও সফল পদচারণা। আমাদের আদি শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিজের সংগ্রাম আর সাফল্যগাথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

ক্ষেত্রটি বেছে নিলেন যে কারণে

বাবা ফরেন মিনিস্ট্রিতে ছিলেন স্বাধীনতার পর নিজ দেশে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন বাবা গ্রামের লোকদের ভয় পান। যদিও তিনি সাতক্ষীরার এক গ্রামেরই মানুষ তারপরও ভাবেন তারা শহরের মানুষদের আপন করতে পারে না। বাবার এই ধারণা পালটে দেয়ার শপথ নেন তিনি। চ্যালেঞ্জ এ ধারণা ভুল প্রমাণ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স আর যাদপপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স করার পর শিরিন চাকরি নেন ইডিএম নামক একটি সুইস অর্গানাইজেশনে। টানা এগার বছর কাজ করেন সেখানে। কাছ থেকে দেখেন নারী কুটির শিল্পীদের শিল্প, তবে এখানে ছিল অনেক বাধ্যবাধকতা। গ্রামের মেয়েদের অনেক কাজ করার সামর্থ আছে। তবে এনজিওগুলো ততবেশি পণ্য নিতে পারছে না। দু’চারশ পিস পণ্য নিয়ে তারা ক্ষান্ত হন। কিন্তু বিশ্ববাজারে চাহিদা অনেক বেশি। উৎপাদকদের ক্ষমতাও অনেক। তাই তাদের অলস না করে কাজে লাগানো উচিত। এমনই এক উপলব্ধি থেকে সহকর্মী আহসানুল হককে নিয়ে শুরু করেন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এএসকে হ্যান্ডিক্র্যাফট লিঃ। সেটা ১৯৯৭-এর কথা।

যখন শুরু করেন

চাকরির অর্থ ছিল সীমিত। তবে উদ্যোম ছিল অসীম। আর ছিল এগার বছর এ ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা। পুঁজি এইটুকু। তাই পথটা কঠিন। সে সব দিনের কথা মনে করে আজো শিরিনের চোখে মুখে আনন্দের হাসি ঝিলিক দেয়। তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, খুব, খুবই কঠিন ছিল সেসব দিন। মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের কাছে দুটো ছোট রুমে শুরু হয় আমার যুদ্ধ। ধানমন্ডি থেকে রিকশায় যেতাম। অনেক কষ্ট করে নিজেরই গ্রামে গিয়ে শুরু করি। মেয়েদের সম্মত করি কাজে। কারণ কাজটাতো আমারও।

বাধা আসবেই

এনজিও মানে লাভ-ক্ষতির কোন মাথাব্যথা নেই। পৃথিবীর সব দেশেই ওদের শাখা আছে। যাকে বলে ‘এটিও বায়ার’। মানে অলটার নেটিভ ট্রেডিং অর্গানাইজেশন বায়ার। এনজিওতে কাজ করার সময়ও তার মেলায় অংশ নেয়ার আগ্রহ ছিল। তবে এনজিওর না। এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে শিরিন বলেন-

‘আমার সাথে প্রথমে মেয়েরা কাজ করতে চাইলো না। তাদের পরিবারও রাজি ছিল না। এনজিওদের মতো আমরা স্রোতের টানে গা ভাসাতে পারবো না। কারণ আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে। ভাল পণ্য দিতে হবে। প্রডিউসার ধরে রাখতে হবে। মানসম্পন্ন পণ্যও হতে হবে। সবদিক ঠিক রেখে কাজ শুরু হল। আমাদের পণ্য নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টে মেলায় অংশ নিলাম। একটা বড় ক্রেতাও পেলাম। আমেরিকার সেই ক্রেতা আজো আমাদের সাথে আছেন।’

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি

শিরিন মনে করেন পরিশ্রম করলে, কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে একসময় সাফল্য আসবেই। দিনের পর দিন নিজের হাতে পণ্য প্যাকেট করা, লেবেল লাগানো, বাঁধা সব করেছেন। তখন কমলাপুর দিয়ে মাল যেত। ট্রাকে মাল পাঠিয়ে নিজেরা রিকশা করে রেলস্টেশনে চলে যেতেন। গুড কন্টিনার ছাড়া মাল পাঠানো যায় না। নিজেরা কন্টেইনারে ঢুকে মাল সেট করতেন। কুলিরা সেট করলে ৬টি পণ্য কম যেত। যা ক্রেতারা পছন্দ করতো না। এতে কুলিরা রাগ করতো। নিজেরা মাল সেট করার পরও তাদের পয়সা দিতে হতো। ওরা বুঝতো না বিদেশী ক্রেতাদের মন। এভাবে ছ’মাস, এক বছর, দু’বছর। এএসকে হ্যান্ডিক্রাফট বিদেশে নিজের জায়গা করতে পারল। অন্যান্য মেলায়ও তারা অংশ নেন। প্রয়োজন হয় বড় অফিসের। আরো জনবলের। ইকবাল রোডে একটা একটু বড় অফিস নেয়া হল। পাঁচবছর সেই অফিসে ছিল এই প্রতিষ্ঠান। বছরে যত মেলা হয় সবদেশের মেলাতেই শিরিন অংশ নেন। এখন শিরিন দত্তকে ঢাকায় পাওয়া যায় না। বছরের বেশিরভাগ সময় হয় গ্রামে নয় তো বিদেশে থাকতে হয় তাকে।

এএসকে হ্যান্ডিক্রাফট এর কিছু কথা

ওয়ালমার্টসহ বিশ্বের বড় বড় চেইন প্রতিষ্ঠানগুলো শিরিন দত্তের সাথে ব্যবসা করতে আসে। কিন্তু নিজেদের সমর্থ্যের কথা বিবেচনা করেই তিনি অনেককে ফিরিয়ে দেন। শিরিন তাদের বুঝিয়ে বলেন, ‘সব কিছুই আমাদের মেয়েরা হাতে করে। তোমরা ইচ্ছা করলেই টাকা দিলেই এই সময়ের মধ্যে এত এত পরিমাণ মাল দেয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে শিরিনের প্রতিষ্ঠানে তিন হাজার কর্মী আছে। তাদের সমবায়ের মাধ্যমে কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক ছয়টি পাকা সেন্টার নির্মাণ করেছেন তারা। সেইসব সেন্টারে চলে তাদের কাজ।

বর্তমানে ট্রেনিং শেষ করা কর্মীর সংখ্যা ৫০০ আরও ১২০ জন কর্মী ট্রেনিং নেয়ার পর্যায়ে আছে। কর্মীদের ছোটখাট রোগ-বিরোগে নয়, তবে বড় কোন অপারেশন বা চিকিৎসায় এএসকে সব সময় দায়িত্ব নেয়।

অভিজ্ঞতার কথা

দেশে-বিদেশে অনেক অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছেন শিরিন। তবে কষ্ট আর আনন্দের যে অভিজ্ঞতা তিনি উল্লেখ করেন তা হল ‘আমার সব কিছু নিজের চোখে দেখার প্রবল ইচ্ছা। কারণ আমি মনে করি যে কাজ আমি করবো তা সম্পর্কে কেউ যেন আমাকে না বলতে পারে তুমি এইটা জানো না। তাই প্রথম দিকে একবার কুষ্টিয়ায় পাতা সংগ্রহ দেখতে চাই। আমার এক পুরুষ সহকর্মীই নানাভাবে আমাকে ভয় দেখিয়েছে। এলাকা খারাপ, রাতে মেয়ে হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। ১৬ কিলোমিটার আমি সেই রাতে গিয়েছিলাম। ১৬ কিলোমিটার মনে হয়েছিল অনন্ত পথ। যখন আলমডাঙ্গায় গিয়ে আমার কর্মীর সাথে দেখা হল তখন মনে হল জানে পানি এল। কত দোয়া-দরুদ যে সে রাতে পড়েছিলাম। আমি মানসিক ও শারীরিকভাবে বরাবরই কঠিন একজন মানুষ।

বডিশপ কোয়ালিটি কন্ট্রোলের জন্য একটি ওয়ার্কসপ আয়োজন করে। আমি সেখানে নিমন্ত্রিত হয়ে যাই। এখানে শীর্ষস্থানে ছিলেন আনিতা রডিক। আনিতা বিশ্বের ৫ম ধনী ব্যবস্থাপক। আমার খুব গর্ব হয়েছে এই ভেবে যে আনিতা একজন নারী। আমি জেনেছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যানেজার নারীরা। কারণ তারা সুন্দর করে সংসার ম্যানেজ করে। আমিও সেখানে একজন বক্তা ছিলাম। বলা যায় পুরো বিশ্ব এখানে উপস্থিত ছিল। এখানে কোয়ালিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছি। কোয়ালিটি আসলে কি? যেটা তোমার চোখে দেখতে ভাল লাগবে না সেটা তুমি বাজারে পাঠাবে না। তুমি কোয়ালিটির সবচেয়ে বড় বিচারক।’

সম্ভাবনা আর ভবিষ্যতের কথা

এক্ষেত্রে সম্ভাবনা অনেক। চাহিদা আছে আমাদের এই সকল পণ্যের। তবে হাতে তৈরি বলে অনেক চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলা যায় না। এইসব ঝুড়ি, বাক্স, ফার্নিচারগুলোর কাঁচামাল আসে প্রকৃতি থেকে। তালপাতা, খেজুরপাতা, গোলপাতা, বেত, হোগলা প্রভৃতি দিয়ে সুই আর দা এর সাহায্যে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন এই পণ্যগুলো। তবে চাষাবাদ না করলে আমরা কাঁচামালের অভাবে পড়বো অচিরেই। বেত এখন নেই। কেউ বেতের জিনিস চাইলে বলি পরে দেব। ব্যবসায় না বলতে নেই। কারণ এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি একটি ব্যবসায়িক কৌশল। শুধু অস্ট্রিয়ার একটা বড় ক্রেতাকে আমরা আজও বেতসামগ্রী দিয়ে আসছি।’ এই বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা জানতে চাইলে, তিনি জানান-‘জমি কোথায়” মানুষ ধান লাগাবে না বেত লাগাবে বলেন? তারপরও এ সকল বিষয় নিয়ে আমরা সরকারের সাথে আলোচনা করছি।’ পাতা শুকাতে বাধ সাধে বৃষ্টি। তাছাড়া তেমন কোন শত্রু নেই হ্যান্ডিক্র্যাফটের। এ শিল্পে লাভ কম। গার্মেন্টস তাদের তুলনায় অনেক বেশি লাভ করে। কারণ তারা অনেক বেশি মাল পাঠাতে পারে। এদিকটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একবারে আমি সর্বোচ্চ ৯৮ কন্টেইনার মাল রপ্তানি করেছি। এই পরিমাণ গার্মেন্টস প্রোডাক্ট হবে বিশাল একটা সংখ্যা। তবে আমাদের লসও অনেক কম। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের মতো এক লসে পতনের সম্ভাবনা নেই। তার উপর সরকারও ১৫%-২০% ইনসেনটিভ দেয় (কাজের জন্য অর্থ সহযোগিতা)।’ এজন্য পণ্যের মূল্যমান কম রাখা যায় বলে শিরিন সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আরও জানান- চায়না, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করে আজ বাংলাদেশের হ্যান্ডিক্র্যাফট একটা ভাল অবস্থানে আছে। আমাদের পণ্যের সাথে তাদের পার্থক্যটা কি জানতে চাইলে বলিষ্ঠ কণ্ঠে শিরিন বলেন, কোন পার্থক্য নেই। শুধু কাঁচামাল ছাড়া। তারা অনেক সময় মেশিন ও আর্টিফিসিয়াল কাঁচামাল ব্যবহার করে যা আমরা করি না।’

সংসার আর কাজ

স্বামী আর এক কন্যা সন্তান নিয়ে শিরিনের সংসার। কাজের জন্য স্বামী কখনোই না বলেননি। মেয়েও গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে। সকাল ৯টায় বাড়ি ছেড়ে তিনি ফেরেন রাত ৭টায়। এরপরের সময়টা একান্তই সংসারের জন্য। মাঝে মাঝে তিনি বাইরে ডিনার করেন। আর নয়তো ডিনার করে বের হয়ে যান। বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিতে। সংসার কাজের পথে বাধা কিনা জানতে চাইলে, সোজাসাপটা শিরিন বলেন, ‘বাধা থাকবেই তাকে অতিক্রম করতে হবে। ব্যবসার মতো সংসারেও কৌশল করে চলতে হবে। এ বিষয়ে শিরিনের ভাষ্য ‘আমাদের আগে অনেক নারী সংগ্রাম করে কাজের ক্ষেত্রটা তৈরি করে গেছেন। আমরা তাদের অর্জন ভোগ করছি। পরের জেনারেশন আরো বেশি করবে। অনেকে বলেন যে এখন নারীকে বেশি স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে। আমি বলি কেউ আমাদের স্বাধীনতা দেয়নি এটা নারী অর্জন করেছে।

আত্মতৃপ্ত শিরিনের আহ্বান

যখন এএসকে যাত্রা শুরু করে তখন একটা মহিলাকে ঘর-সংসার সামলে কাজ করতে হতো। স্বামী সময়মতো ভাত না পেলে তার গায়ে হাত দিতেও কুণ্ঠাবোধ করতো না। অনেক পরিবার শিরিনকে বলেছে, ‘নিজে তো ঘরের বাইরে গেছেন। এখন আমাদের মেয়েদের জাত মারতে চান। আজ চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। পুরো পরিবার এখন এক হয়ে এই কাজ করছে। স্বামী পাতা সংগ্রহ করে। স্ত্রী পণ্য তৈরি করে। আর সন্তান পণ্যের হিসাব রাখে। অনেক স্বামী আজ গৃহস্বামী হয়েছেন। শিরিনের ভাষায়, ‘এই পরিস্থিতি দেখতে পারা যে আমার জন্য কত আনন্দের তা ব্যক্ত করা যাবে না।’

শেষ কথা নতুনদের জন্য

নিজের প্রতিষ্ঠানের তিন হাজার কর্মীকে ত্রিশ হাজারে উন্নিত করার স্বপ্নে বিভোর শিরিন মনে করেন, তিনি যখন এ কাজ করছেন, তখন সকলেই তা পারবে। শুধু প্রয়োজন গ্রামের কর্মীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক আর ধৈর্য্য !

0