আমাদের গাজী তৌহিদুর রহমান


২০১১ সালে আমরা শুরু করি চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব গ্রুপ। তারপরই আমার একদল উদ্যমী, হার না মানা তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। এদের কেউ উদ্যোক্তা হবে, কেউ ইকো সিস্টেমে কাজ করবে, কেউ লড়াই করবে। প্রতিদিনই নতুন কারও সঙ্গে আলাপ হয়। এরই মধ্যে একদিন আলাপ হলো এমন একজনের সঙ্গে যে কিনা চাকরি বাকরি ছেড়ে এ লাইনে এসেছে এবং নিরন্তর কষ্ট করে চলেছে। কারমাঙ্গির চরে তার একটা ডিসপোজেবল প্লাস্টিকের কারখানা আছে।

‘তোমার প্রোডাক্ট কী?”
জানতে চাইলে জানালো – বিস্কুটের ট্রে।

তারপর থেকে আমি বিস্কুট কিনলে প্যাকেট খুলে দেখতাম ট্রে টা কার বানানো। এফ এম প্লাস্টিক দেখলেই মোঃ গাজী তৌহিদুর রহমান এর মুখটা আমার সামনে ভেসে উঠতো।

তৌহিদের রক্তে কিন্তু ব্যবসা নেই, কিন্তু কী এক আশ্চর্য তাড়না তাঁকে উদ্যোক্তা করেছে সেটি বোঁঝা অসম্ভব নয়। নিজে একটা কিছু করার তাড়নাই তাকে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাংক-বীমাতে যোগদানে উৎসাহিত করে নাই।

১৯৯৫ সালে ম্যানেজমেন্টে পাস করে তৌহিদ একটা বায়িং হাউসে যোগ দেয়। ১১ মাস চাকরি করে সেটা ছাড়ে। শুরু করে ট্রাভেল এজেন্সি, প্রিন্টিং আর মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসা। কিন্তু সুবিধা হয় না। এর মধ্যে বিয়ে করে। মা মারা যান। জটিলতা বাড়ে। ব্যবসা দাড়ায় না। সংসারে অশান্তিও।

কী আর করবে। সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়া। কিন্তু এরই মধ্যে বন্ধুবান্ধবরা কয়েকটা প্রমোশনও পেয়ে গেছে। চাকরিতে মনও টেকে না। কিন্তু ব্যবসার পূঁজি কয় পাবে? বিনিয়োগ করলো কিছু শেয়ার বাজারে। আর খুঁজতে থাকলো কী করা যায়?

২০০৭ সালে গুলশান ব্রাঞ্চে থাকার সময় এক বন্ধুর মাধ্যমে ডিসপোজেবল প্লাস্টিকের কথা জানতে পারে। ব্যাস, তার ভরসায় চাকরি ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু বিধি হলে বাম, কী করবে রাম? চাকরি ছাড়ার পর পার্টনার রণে ভঙ্গ দিল। শেয়ারবাজার থেকেও তেমন কিছু পাওয়া গেল না। মরিয়া তৌহিদ দুজন টেকনিক্যাল পার্টনার, একজন কর্মী, দুটি ম্যানুয়াল মেশিন নিয়ে আহমদবাগে বিস্কুটের ট্রে বানাবার ফ্যাক্টরি দিল। কিন্তু কাজ কই পাবে? কাজেই স্বচ্ছ প্লাস্টিকের যা যা বানানো যায়, ব্লিস্টার প্যাকেজিং , মোবাইলের ব্যাটারি, চার্জার, মাজুনির কাভার – সব বানাতে শুরু করলো। তারপরই পাওয়া গেল ইউনাইটেড এমিরেটসের ১ লক্ষ ডিস কাভার তৈরির কাজ। ব্যাস ঘুরে দাড়ালো তৌহিদ। লালবাগ, কামরাঙ্গীর চরে ভাঁড়া নিয়ে শুরু হলো দ্বিতীয় অধ্যায়।

এখন নরসিংদীতে ওর বিশাল ফ্যাক্টরি। কাজ করে ২০০+ লোক। হেন কোন কোম্পানি নেই যার জন্য প্লাস্টিক সামগ্রী বানায় না সে। বাজারেও তার অনেক সুনাম। বিনিয়োগকারীরাও সঙ্গে আছে।

অনেক দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তত আমাদের গাজি তৌহিদুর রহমান। প্রমাণ করেছে সততা, নিষ্ঠা ও লেগে থাকাটাই উদ্যোক্তার সবচেয়ে জরুরী কাজ। বিজয় আসবেই।

 

এবােরর জাতিয় এসএমই পুরস্কার পেয়েছে তৌহিদ। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিযেচে তার স্বীকৃতি। তার আগে ২০১৬ সালের ইউছুুফ চৌধুরী সম্মাননা পেয়েছে উদ্যোক্তা হিসাবে।

আজ থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব উদ্যোক্তা সপ্তাহ।
উদ্যোক্তা সপ্তাহে এফ এম প্লাস্টিকের তৌহিদুর রহমানের মতো উদ্যোক্তারা আমাদের ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করে যাবে। নতুন যারা উদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভাবছে, তৌহিদ তাদের জন্য এক নিরন্তর অনুপ্রেরণার নাম।

অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা তৌহিদ।
জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক।

– মুনির হাসান

0