আমার উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা। এই লেখা যারা উদ্যোক্তা হতে চান তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।


একটু পেছনের ইতিহাসঃ 17 জুন 2001, তিন বন্ধু (নাছের, মিলন, আমি) বাড়ি ছাড়লাম। সিদ্ধান্ত নিলাম আর বাড়ি নয়, যেতে হবে ঢাকা। পড়া-লেখার যবনিকাপাত। এবার কিছু একটা করা চাই। আর সেই কিছু একটা করার স্থান অবশ্যই ঢাকা। ঢাকায় যাওয়ার পর ফলাফল- তিনদিনের মাথায় নাছেরের চাকরির ডাক। চাকরিস্থল সুদূর চুয়াডাঙ্গা। মাসখানেক পর মিলনের বাড়ি ফেরা, আর আমি ঢাকা ছাড়ব না ঘোঁ ধরে ঢাকায় পড়ে থাকা।

উদ্যেক্তা

2008 সালঃ

নাছের ততদিনে গাজীপুরে একটি বড় কোম্পানীর বড় অফিসার। ততদিনে বিয়েথা করে সংসারি এবং এক মেয়ের গর্বিত বাবা। আরেক মেয়ে আসছি আসছি করছে। ও সব সময় ঢাকায় আছি কিন্তু ঢাকার পাশে গাজীপুরে গিয়ে তার মেয়েটিকে একটি বার দেখে আসলাম না বলে অনুযোগ করে। শেষ পর্যন্ত আরেক বন্ধুসহ গেলাম তার বাসায়।

এখানেই পথের শুরুঃ

ওর বাসায় কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাইরে একটু ঘুরতে গেলাম। ও নাকি কি একটি ফ্যাক্টরী নিজেই দিয়েছে কিন্তু ওর কোম্পানী (যেখানে চাকরি করে) কোন এক কারণে তাকে সেই ফ্যাক্টরী উঠিয়ে নিতে বলেছে। সুতরাং তার ফ্যাক্টরী বন্ধ। গিয়ে দেখলাম এটা একটি পিলার ফ্যাক্টরী। ঘর-বাড়ি তৈরীতে ব্যবহার হয়। আমাদের দেশে এটা বগুড়ার পিলার হিসাবে পরিচিত। দেখে বেশ ভালই লাগল। কারণ আমাদের দেশে সাধারণত ঘরবাড়ি তৈরীতে হাতে তৈরি চারকোনা পিলার ব্যবহার হয়ে থাকে, কিন্তু এই পিলার গুলো আটকোনা, মেশিনে তৈরী হয় এবং ফিনিশিং অসাধারণ।

নতুন স্বপ্ন, নতুন আশাঃ

ততদিনে বন্ধু মিলনেরও প্রবাস জীবন প্রায় 5/6 বছর। এর মধ্যে বিয়ে করে সেও এক ছেলের গর্বিত পিতা। শুধু আমিই তথৈবচঃ একদিন সকালে মিলনের ফোন, বুঝলাম সে হুট করে দেশে চলে এসেছে, বিমানবন্দরের কাছেই আমার বাসা কিন্তু ও আমাকে একটু জানালাও না যে দেশে আসবে। মাত্রই 6/7 মাস আগে একবার দেশ থেকে ঘুরে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম কাহিনী কি? ওর জবাব বিদেশ আর ভাল লাগে না। এর দু’তিন দিন পর নাছের ফোন দিল, সে জানাল বাড়ি আসবে, আমি আসব কিনা। অগত্যা রাজি হয়ে গেলাম, ভাবলাম তিন বন্ধু অনেক দিন পর, মন্দ হয় না। তারপর তিন বন্ধু অনেকদিন পর মিলিত হলে যা হয় আরকি…….. আড্ডার ফাঁকে চলল কি করছি, কি করব টাইপ আলোচনা। মিলন জানাল সে আর বিদেশ যেতে চায় না, বিদেশ আর ভাল লাগে না। আমরা বুঝাই, ’’দেখ, আরেকটা বার ঘুরে আয়, অনেক বাঙ্গালী থেকে তুই বিদেশে ভালই আছি, ভালই কামাচ্ছিস, দেশে আসলে একটু পুঁজি রেডি কর যা দিয়ে কিছু করা যাবে।’’ কিন্তু কোন হিতোপদেশেই কাজ করল না, সে আর যাবেই না। কথায় কথায় বন্ধু নাছেরের সেখানকার সেই আটকোনা পিলারের কথা উঠল, মিলনের প্রস্তাব, আমরা কি তেমন একটি ফ্যাক্টরী দিতে পারি না? নাছের প্রথমে রাজি হলো না, বলল আমরা পারব না এবং আমাদের এলাকায় এগুলো সম্ভবত চলবে না। পরে সিদ্ধান্ত হলো মিলনের এক ফুফাত ভাই এই পিলার বিক্রি করে, উনার সাথে কথা বলে দেখি কি বলে। উনার সাথে কথা বলার সাথে সাথেই উনি বললেন ভাল প্রদক্ষেপ। এই প্রোডাক্ট ভালই চলে। এবার দেখি নাছেরও রাজি, সে পার্টনার থাকবে না, তবে আমাদের সব রকমের হেল্প করবে। তখন মিলন প্রস্তাব দিল আমি পার্টনার হতে, কারণ তার একার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু আমিও রাজি না। কারণ আমার এলাকায় থাকার এলার্জি, ঢাকা না ছাড়ার পণ। সেই সাথে অবশই অর্থ সংকট। এর থেকেও বড় সংশয় ’’এই মাল আদো চলবে তো?‘‘ এরপর মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয়ে গেল এই ফ্যাক্টরী হবেই। কিন্তু আমি রাজি না। মন কোন ভাবে সাড় দেয় না। যে যার মতো আবার চলে গেলাম স্ব স্ব স্থানে, বন্ধু নাছের, যাকে কিনা কর্মব্যস্ততার কারণে মোবাইলে একটা মিনিট পাওয়া মুশকিল সে প্রতিদিন আমাকে রাজি করানোর জন্য 3/4 বার ফোন করে। আমি রাজি হই না…. হই না…. হই না….. এবং অনেক চিন্তা করে একদিন হতে হলো। অনেক ভাবনার মধ্যে একটি ভাবনা ছিল, প্রত্যেক মানুষই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটা না একটা সুযোগ পায়, কেউ সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে কেউ পারেনা। অনেক মানুষকে দেখেছি আফসোস করে বলতে ’’আহা… আমি সেখানে থাকলে/ সেই কাজটা করলে এখন কি ভালটাই না থাকতাম!‘‘ কিন্তু সেই ভুলের প্রায়শ্চিত করা জীবনে আর হয়ে উঠে না। আমারও মনে হতে লাগল, আমি যদি বন্ধুদের কথা না শুনি তবে কি জীবনের একটি ভুলই করব?

স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম প্রদক্ষেপঃ

সিদ্ধান্ত তো হলো, কিন্তু টাকা কই? মিলন বিদেশের টাকায় চোট্ট একটা জমি কিনেছিল এবং সে জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিল। আর আমি ফকির কি করি? আমার তো কিছুই নাই, কিছু টাকা ছিল শেয়ার বাজারে, ফকির দরবেশরা সেটাকা গিলে গিলে যাচ্ছে। প্রতিদিন ট্রেডিং শেষে পোর্টফোলিও খুলে ‘‘আগ্রহ’’ ভরে দেকি আজ কত টাকা গেল। যেতে যেতে অনেক গেলেও তখনও কিছু টাকা ছিল, একদিন দিলাম সব বিক্রি করে। কিন্তু সে টাকা দিয়েও তো হয় না, অগত্যা প্রবাসি ভাইয়ের কাছে হাত পাতলাম এবং উনি নিরাশ করলে না। শুরু হলো ‘‘শিল্পপতি’’ হওয়ার প্রথম প্রদক্ষেপ। জায়গা হলো,ঘর হলো বাকি যন্ত্রপাতি। মুলত আমরা এই ব্যবসার ‘‘ব’’ও জানি না। সারাদিন খাতায় অংক কষি ‘এই করলে এই হবে, সেই করলে সেই হবে।’ যন্ত্রপাতির ভার পড়ল নাছেরের উপর সে’ই সব কিছু তৈরি করাবে এবং লোক দিয়ে সব সেট করে দেবে। সে আমাদের আশ্বাস দিল সে একটু ডিফারেন্ট টাইপ যন্ত্রপাতি দেবে যা সহজে নষ্ট হবে না। তবু মন থেকে ভয় যায় না, জানি না বুঝি না এমন একটি কাজে হাত দেয়া কি ঠিক হলো? দুরুদুরু বক্ষে একদিন যন্ত্রপাতির জন্যও টাকা দিয়ে দিলাম। এবার অপেক্ষার পালা যন্ত্রপাতি কখন আসে। কিন্তু অপেক্ষা আর পুরোয় না। আজ আসবে, কাল আসবে বলে শেষে প্রায় পাক্কা আড়াই মাস পর যন্ত্রপাতি এলো এবং যন্ত্রপাতি দেখে আমাদের দুই পার্টনারের আক্কেল গুড়ুম। এই যন্ত্র দিয়ে আমরা কি করুম? এ যে বিদ্যুতের খাম্বা তৈরীর মেশিন। কিন্তু বন্ধু নাছের তার সিদ্ধান্তে অনড়, ওর মতে ও ঠিক যন্ত্রই দিয়েছে। কিন্তু আমাদের মন বলছে এই যন্ত্র দিয়ে কিছুই হবে না। কি আর করা, যন্ত্র সেটিং-এ নেমে পড়লাম। যে কাজ একদিনে শেষ করা যায় সে কাজ অবশেষে প্রায় বিশ দিনে শেষ হলো। এবং শেষ দিকে এসে একটি মেশিন আমার বাম হাতের দুটো আঙ্গুল খেয়ে ফেলল। শুরু হলো লাইফের আরেক পার্ট, ডাক্তার, হাসপাতাল দৌড়াদোড়ি। চিকিৎসার জন্য আমি ঢাকায়। আর বন্ধু মিলনের জীবন ওষ্ঠাগত এই যন্ত্রপাতি নিয়ে, এগুলো দিয়ে যে কিছুই হয় না। অনেক কষ্ট করে এগুলো যাও কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করা গেল তাও সবচে বড় সমস্যার সমাধান করা গেল না। দেখা যাচ্ছে আমরা একটি পিলার তৈরি করতে যত সময় লাগছে সেই একই সময় অন্য ফ্যাক্টরী গুলো তৈরী করতে পারবে কম করে হলেও 10টা পিলার। এভাবে চললে তো লাভ তো দূরের কথা, বাপের বাড়ি বিক্রি করে লেবারের বেতন দিতে হবে। লেবার না পাওয়া আরো বড় একটি সমস্যায় পরিনত হলো। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখি অমানিশার অন্ধকার।

নতুন হাঙ্গামাঃ

এর মধ্যে বাপ-মা হাতের নাগালে পেয়ে শুরু করে দিল আরেক যন্ত্র না। এবার নাকি বিয়ে করতে হবে। আমার অবস্থা ‘‘খাল নাই কুত্তার বাঘা নাম’’। নিজে খাই বাপের হোটেলে, একটাকা নাই রোজগার আমি করুম বিয়া। এছাড়াও আছে চিরকুমার থাকার প্রতিজ্ঞা। আফটার অল আমি আবার চিরকুমার সংঘের সভাপতি। সে আরেক কাহিনী…… যাইহোক…. বিয়ে নিয়ে অনেক মিটিং হলো এবং সব ব্যার্থ করে দিলাম। শেষে সবাই মিলে এমন এক চাল দিল যে, 100% বেকার আমি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম।

স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাঃ

লেবার সমস্যা শেষ পর্যন্ত নাছেরই সমাধান করল। ও কয়েকজন লোক পাঠাল এবং অবশ্যই বেশ কর্মঠ তারা। কিন্তু এই যন্ত্রপাতির কাছে তারাও ফেল মারল। ওরা সারাদিন পরিশ্রম করেও 15/20টা পিলার বানাতে পারে না। কোন ভাবেই না। শেষমেশ ওরা একদিন রাতের অন্ধকারে পলায়ন করিল। হিসাব করে দেখলাম বিভিন্ন ভাবে তাদের কাছে আমরা 18000/= টাকা পাওনা ছিলাম। শুরু হলো অন্ধকারে ডুবার। ফ্যাক্টরীর বন্ধ, এই যন্ত্র দিয়ে হবে না, সম্পূর্ণ নতুন যন্ত্র তৈরী করতে হবে। বলা যায় ফ্যাক্টরী আবার নতুন করে দিতে হবে, অথবা বন্ধ করে দিতে হবে। কঠিন এক সময়ের শুরু। পিছনে যাওয়ার পথ নাই কারণ যা কিছু টাকা পয়সা ছিল সর্বস্ব এখানে দিয়ে দিয়েছি এমন কি ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়েও। সামনে যাওয়ার পথ নাই কারণ নতুন করে ইনভেস্ট করার মতো একটা টাকাও নাই। আমার পার্টনার বন্ধুরও একি অবস্থা। বাড়তি হিসেবে ও কেন বিদেশ গেলনা সেই কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে জনে জনে। যদিও তখনও ওর ভিসার মেয়াদ ছিল, ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারত।

বলে রাখা ভাল, নাছের আমাদের এই সময়ে অনেক আর্থিক সাহায্য করেছে (যা এখনো শোধ করা হয়নি)। ও যা করেছে কোন ভাইও ভাইয়ের জন্য করবে কিনা সন্দেহ।

শুরু হলো নিদারুণ যন্ত্রণার দিন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিন। ঘরে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। কি করে কিনি ঔষধ, কি করে কিনি ওর জন্য একটু ভাল খাবার? কি করে চলবে সংসার? ফ্যাক্টরী বন্ধ কিন্তু খরচ আছে প্রতিমাসে। ফ্যাক্টরীর খরচ, নিজের খরচ…… বসে বসে নিজের চুল নিজে ছিঁড়ি। ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠি। এক একদিন মনে হয় অনেক গভীর কোথাও তলিয়ে গেলাম, আর ফেরার উপায় নাই।

একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম সব যন্ত্রপাতি কেজি দরে ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করে দেব। কারণ এই যন্ত্র কারোরই কোন কাজে লাগবে না। এবং শেষ পর্যন্ত লাখ লাখ টাকার যন্ত্র সের দরে মাত্র 27000/= হাজার টাকা বিক্রি করে দিলাম। বিশ্বাস হয়? মাত্র 27000/=?

আবার নতুন করে শুরু করার জন্য ব্যাংকের কাছে লোন চাইলাম। কিন্তু ওরা দেবে না। কারণ ওরা ‘‘তেলা মাথায় তেল ঢালে।’’ ওরা ব্যাংক ট্রানজেকশন চায়, ব্যবসার মেয়াদ তিন বছর চায়। আরে শালা, আমার এগুলো থাকলে তোদের কাছে যাই?

আবার নুতন করে শুরুঃ

অতঃপর আবার প্রবাসি ভাইয়ের কাছে হাত পাতা। উনি নিরাশ করলেন না। আবার দিলেন টাকা। এই কৃতজ্ঞতা কোন দিন শেষ করা যাবে না। শুরু হলো নতুন উদ্যেমে আবার যন্ত্রপাতি তৈরী করা। এবার আর কারো সাহায্যে না, সম্পূর্ণ নিজেদের শ্রম ও চেষ্টায়। অভিজ্ঞতার জন্য ঘুরেছি অনেক জায়গায়। তিল তিল করে নিজেরাই তৈরী করেছি/করিয়েছি সব কিছু। এবার সফল হতেই হবে এই প্রতিজ্ঞা করলাম। পরিশ্রম করলে তার সুফল একদিন আসবেই, পরিশ্রম বৃথা যেতে পারে না এই বিশ্বাস ছিল মনে। দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে একে এক সব কিছু তৈরী করলাম। এবার নতুন করে প্রোডাকশন শুরুর পালা। কিন্তু আবার বিপদ। যন্ত্রপাতি তৈরীতেই সব টাকা শেষ, কাঁচামাল কিনব কি দিয়ে? একদম অল্প কিছু টাকা ছিল যেগুলো দিয়ে খুব অল্প অল্প কাঁচামাল কিনে প্রোডাকশন শুরু করলাম। প্রোডাকশন না বলে একে ছেলে খেলা বলাই ভাল। কারণ এভাবে আর যাই হোক, ব্যবসা হয় না। ব্যাংক লোন দেবেনা, কোথাও থেকে ধার নেব তাও সম্ভব না। গ্রামের এক বড় ভাই সব শুনেটুনে এক লাখ টাকা সুদের উপর নিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিলেন। সুদ? দুচোখে দেখতে পারি না। কিন্তু কি করব? সেই এক লাখ টাকা নেয়া ছাড়া উপায় রইল না। এলাকার 3/4 জন লেবার নিয়ে এবং তাদের সাথে নিজেরা লেবার খেটে শুরু করে দিলাম। সারা জীবন কাটিয়েছি বাবুগিরি করে, এখন লেবারের সাথে লেবার হয়ে গেলাম, কিচ্ছু করার নাই। সফল হতে গেলে করতেই হবে।

ইতিমধ্যে বাবা হওয়া দিন ঘনিয়ে এলো। বন্ধু নাছেরের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করলাম। শত দুঃখের মাঝে আল্লাহর রহমতে পুত্র সন্তানের বাবা হলাম। এত আনন্দের মধ্যেও নিজের ভিতর ঝড় বড়ে যেতে লাগল, কারণ যে দিন হাসপাতল থেকে ছাড়পত্র দেবে তার আগেরদিন ও আমি জানি না টাকা কোথায় পাবে আর ছাড়পত্র কি করে নেব। অবশেষে ভাইদের সহযোগীতায় হাসপাতাল থেকে ভালয় ভালয় ছাড় পেলাম।

এদিকে শুরু হলো লেবার খোঁজা। লেবার আর পাই না, মাস যায়… দিন যায় কত জায়গায় খুঁজি লেবার পাই না। আবার চোখের সামনে অন্ধকার। একসময় মনের মধ্যে ঢুকে গেল আমাদের দিয়ে আসলে হবে না। সব কিছু থাকলেও লেবারের কারণে হবে না। প্রথমে যে লেবারগুলো রাতের অন্ধকারে পালিয়েছিল তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু তারা আসার সাহস করে না। ভয় পায়, যদি কিছু করি? কিন্তু আবার সাহসও পায় কারণ ওরা যে কয়দিন ছিল সে কয়দিনে দেখেছে আমাদের সততা, কথা দিয়ে কথা রাখার গুন। কিন্তু একজন আসতে রাজি হলে অন্য জন্য রাজি হয় না করে করে কেটে গেল প্রায় 5/6 মাস। এরপর একদিন ওরা সাহস করে চলেই এলো। গত ডিসেম্বরের 10 তারিখ থেকে শুরু হলো আমাদের নতুন করে পথচলা। কিন্তু রয়ে গেলে কাঁচামাল ও আরো যন্ত্রপাতির স্বল্পতা। এর মধ্যে যা ব্যবসা হচ্ছে তা দিয়েই ধীরে ধীরে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা। একসময় নতুন যন্ত্রপাতি আরো কিছু তৈরি করার সামর্থ হলো, কাঁচামালও হলো, সংসারও চালাতে পারছি এই অবস্থায় আরেক বিপদ। যে জায়গা ভাড়া নিয়ে ফ্যাক্টরী দিয়েছি তার মেয়াদ শেষ আগামী ডিসেম্বরে। জমিদার নতুন করে ডিট করবে না তাই নতুন জায়গা দেখতে হবে। তবু ওদের থেকে সময় নিয়েছি সামনের বছর জুন পর্যন্ত। এর মধ্যে নতুন জায়গায় যেতে হবে যার জন্য অন্তত 3/4 লাখ টাকা খরচ হবে। আবার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বেশ কিছু নতুন যন্ত্রপাতি বানাতে হবে।

সাজ্জাত ভাই নাকি মুনির হাসান ভাইয়ের একটা কথা মনে পড়ে, ব্যবসা করতে চাইলে চাই ইচ্ছে ও সঠিক পরিকল্পনা। টাকা ভুতে যোগাবে। আমরা একটি ফ্যাক্টরী জন্য যে টাকা খরচ করেছি তা দিয়ে তিনটা ফ্যাক্টরী করা যায়। শেষ পর্যন্ত কিন্তু টাকার অভাবে থেমে থাকি নি।

এত বিপদ কাটিয়ে আসতে পেরেছি, এই টুকু কি পারব না? ইনশাল্লাহ পারব। তাই আগামীর প্রস্তুতিতে ব্যাস্ত আমরা। টাকা যোগাবে ভুতে।

এই লেখা পড়ে যা শিখতে বলব, একদম না জেনে কিছু করতে নাই।

প্রেমে সফল হতে যত কষ্ট করতে হয় তার থেকে শতগুণ বেশী কষ্ট করতে হয় উদ্যোক্তাতা হওয়ার জন্য। গানের সাথে মিলিয়ে বলতে হয়, পথের কাঁটায় পায়ে রক্ত না ঝরালে কি করে এখানে তুমি আসবে ? সুতরাং সাফল্যের জন্য কষ্ট স্বীকার করতে না পারলে কেরানীগিরি করুন।

লিখেছেন- Golam Sarwar Shazal

0