আলুবীজের উদ্ভাবক ড. তুহিন শুভ্র রায়


দেশের আলু উৎপাদন পদ্ধতির বাইরে আধিক উৎপাদনশীল আলুর বীজ উদ্ভাবন করেছেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন শুভ্র রায়। তিনি বলছিলেন তার উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিযে। তার সাক্ষাৎকার নিয়ে লেখা।

রফিকুল ইসলাম: স্যার মূলত আপনার গবেষণার বিষয়টি কি ছিল?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: আসলে সনাতন পদ্ধতিতে আলু চাষের বাইরে আধিক উৎপাদনশীল একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনই ছিল মূল বিষয়।আমরা মূলত টিউবার দিযে যে আলু চাষ করে থাকি তার উৎপাদন আশানুরূপ হয় না। অন্যদিকে কৃষকদের কাছে এটি সহজলভ্য নয়। তাদেরকে নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উপর, আবার এর গুণাগুণ নিয়েই প্রশ্ন আসে।এই সমস্যা থেকে উত্তরণ এবং আধিক উৎপাদনশীল বীজ উৎপাদনই ছিল মূল লক্ষ্য।

রফিকুল ইসলাম: এটি মূলত কোন পদ্ধতিতে সম্ভব হয়েছে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: এখানে মূলত টিউবার ব্যাতীত ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। একে টি.পি.এস (ট্রু পটেটো সিস্টেম) বলা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে মাত্র বিশ গ্রাম বীজ নিয়ে কৃষকের বীজতলাতে রোপণ করে পরবর্তীতে মূল জমিতে রোপণ করা হয়ে থাকে। সবচেযে বড় সুবিধা হচ্ছে এই পদ্ধতিতে আলু গাছের কান্ড যতটুকু মাটি দিযে ঢেকে দেয়া হবে ততটুকু পর্য়ন্ত আলু ধরবে।

রফিকুল ইসলাম: এই পদ্ধতিতে কি অন্য কোন দেশে আলু চাষ হচ্ছে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: অবশ্যই। বিশেষ করে ভারত, চীন প্রভৃতি দেশে অনেক আগে থেকে এই পদ্ধতিতে আলু চাষ হয়ে থাকে।

রফিকুল ইসলাম: আপনার গবেষণা শুরু হয়েছিল কখন থেকে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: মুলত ১৯৯৪ সাল থেকে আমার গবেষণা শুরু। জাপানে পি.এইচ.ডি করা অবস্থায়,পরবর্তীতে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আমার মূল গবেষণা ক্ষেত্র। তবে সফলভাবে বীজ উৎপাদনে সক্ষম হয় ২০১০ সালে।

রফিকুল ইসলাম: আপনার পূর্বে কি বাংলাদেশে কোথাও এই বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: হ্যাঁ। নব্বই দশকের শুরু থেকেই টিউবার ক্রপ রিসার্স সেন্টার (টি.সি.আর.সি) উন্নত বীজ উৎপাদন নিয়ে গবেষণা শুরু করে। সেখানে আমিও কিছুদিন কর্মরত ছিলাম, ফলে সেখান থেকেই অনুপ্রাণীত হযেছিলাম। তবে সফলভাবে মূলত আমিই সম্পন্ন করি।

রফিকুল ইসলাম: আপনার গবেষণায় আর্থিকভাবে কোন প্রতিষ্ঠান সহযোগীতা করেছিল?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: মূলত আমি জাপান সোসাইটি ফর প্রমোশন অব সায়েন্স থেকে বৃত্তি পেয়েছিলাম যা থেকে সম্পূর্ণ গবেষণার খরচ বহন করেছিলাম।তাছাড়া শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ আমাকে গবেষণা অনুমতি এবং গবেষণার জন্য গবেষণাগার এবং প্লট ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল।

রফিকুল ইসলাম: আপনি কি দীর্ঘ সময়ের এই গবেষণা এককভাবে সম্পন্ন করেছেন?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: হ্যাঁ। অনেকে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করেছেন, তবে মূল গবেষণাটি আমার একারই।

রফিকুল ইসলাম: এই আলুবীজ কিভাবে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: আসলে আলু গাছ আমাদের দেশে যে পরিমান আলো পায় তার থেকে অতিরিক্তি পাঁচ ঘন্টা বেশি আলো প্রয়োজন ফুল ফোটাতে । আমি ৩০০০০-৫০০০০ লাক্সের আরো অতিরিক্ত পাঁচ ঘন্টা আলো প্রদান করেছি । পাশাপাশি অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহার করেছি যা আলুর টিউবার বৃদ্ধি কমিয়ে দ্রুত ফুল ফোটেিত সাহায্য করেছে। পরবর্তীতে ফল এবং বীজ।

রফিকুল ইসলাম: এই বীজগুলো দেখতে কেমন?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: মরিচ বা টমেটো বীজের মত তবে আকারে অনেক ছোট এবং সাদা-হলুদ মিশ্রিত বর্ণের।

রফিকুল ইসলাম: এটি হতে কিভাবে কৃষক আলু উৎপাদন করবে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: প্রথমে বীজ বীজতলাতে রোপণ করতে হবে যা থেকে প্রথম বৎসর ১-৩৫ গ্রাম ওজনের ছোট ছোট আলু হবে যার উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৮০-৯০ টন। কিছু আলু কৃষক হিমাগারে রেখে দিতে পারে যা পরবর্তী বছর রোপণ করা যাবে। মূলত একবার বীজ কিনেই কৃষক নিজে নিজেই পরবর্তী বছরের জন্য বীজ উৎপাদন করতে পারবে।

রফিকুল ইসলাম: আপনার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটি কিভাবে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাবে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর। তবে প্রশাসনিকভাবে অধিক গুরত ¡দিলে আমরা খুব দ্রুত সফল হব। স্থানীয়ভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের আরও বেশি উৎসাহিত করা যেতে পারে।

রফিকুল ইসলাম: প্রতিবছর আমরা দেখে থাকি অধিক আলু নষ্ট হচ্ছে, হিমাগারে জায়গা অপ্রতুলতা ,তারপরও কৃষকদের কিভাবে অধিক আলু উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: আসলে সঠিকভাবে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে এই সমস্যা রোধ করা যেতে পারে। তাছাড়া আলু থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো বৃদ্ধি করলে অধিক বেশি আলু ব্যবহৃত হয়ে। ফলশ্রুতিতে কৃষক আরও আলু উৎপাদনে উৎসাহিত হবে।

রফিকুল ইসলাম: আপনার এই উদ্ভাবনকে কিভাবে স্বীকৃত করা হযেছে?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরী কমিশন ও জে.এস.পি.সি (জাপান) ২০১০ সালের মে মাসে আমাকে গোল্ড মেডেল প্রদান করে। এছারাও ইউনাইটেড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্স এর অধিনস্থ আই.ডব্লিউ.এ.টি.ই বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমাকে গোল্ড মেডেল দেয়া হয়।

রফিকুল ইসলাম: আপনার এই সফলতায় আপনার সহকর্মীদেও অনুভ’তি কেমন ছিল?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: সবাই অনেক আনন্দিত। কারণ তারা আমাকে সবসময় সহযোগীতা করেছিলেন।

রফিকুল ইসলাম: আজকের অবস্থানে আসার স্বপ্ন কি ছোটবেলা থেকেই দেখতেন?

ড. তুহিন শুভ্র রায়:আসলে বিষয়টা এমন নয়। নাটোরের গুরুদাসপুরে আমার জন্ম। মধ্যম মানের শিক্ষার্থী ছিলাম। তবে এইচ.এস.সি পড়া অবস্থায় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।

রফিকুল ইসলাম: ডাক্তার না হয়ে আপনি এখন একজন কৃষিবিদি, নিজেকে কিভাবে উপভোগ করেন?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: অনেক উপভোগ করি। কারণ ডাক্তার হলে হয়তবা প্রফেশনাল হযে যেতাম।এখন গবেষণা করছি, কৃষকদের তথা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছি এটাই অনেক পাওয়া।

রফিকুল ইসলাম: সকল কৃষিবিদদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য কি?

ড. তুহিন শুভ্র রায়: সবাইকে একটা কথাই বলতে চাই, আপনারা নিজের প্রদত্ত দায়িত্বটুকু পালন করুন। আন্তরিকতার সাথে প্রতিটা কাজ করুন, তাহলে এই দেশ অনেক সামনে এগিয়ে যাবে।

রফিকুল ইসলাম: দেশের সকল তরুণ গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার উপদেশ কি?ড. তুহিন শুভ্র রায়: প্রাপ্তির কথা না ভেবে নিরলসভাবে সত্যিকার অর্থে কাজ করুন, তাহলে দেশ তথা জাতির উন্নতি সাধিত হবে।

রফিকুল ইসলাম: আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. তুহিন শুভ্র রায়: ধন্যবাদ।

0