spot_imgspot_img

আয়ুর্বেদিক ব্যবসাঃ জিনসেং ঔষধি গুনসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত

জিনসেং কে বলা হয় wonder herbs বা আশ্চর্য লতা। চীনে সহস্র বছর ধরে জিনসেং গাছের মূল আশ্চর্য রকম শক্তি উতপাদনকারী পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও এর রয়েছে নানাবিধ গুন। চীন থেকে কেউ বেড়াতে আসলে সাধারণত দেখা যায় জিনসেং ও সবুজ চা কে গিফট হিসেবে নিয়ে আসতে। সেইরকম একটা গিফট পাওয়ার পরে ভাবলাম যে এই আশ্চর্য লতার গুন কে আসলে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত নাকি এ শুধুই প্রাচীন চাইনিজ মিথ? ঘাটতে গিয়ে পেলাম নানা তথ্য। আমাদের দেশের মানুষেরা এটা সম্পর্কে কম-ই জানেন। তাই জিনসেং সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আজকের পোস্ট।

জিনসেং :

মুলত দুই ধরণের জিনসেং ঔষধি গুনসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত- আমেরিকান ও এশিয়ান। এর মধ্যে এশিয়ান জিনসেং অপেক্ষাকৃত বেশি কার্যকরী। এই দুই ধরণের জিনসেং কে বলা হয় প্যানাক্স জিনসেং। প্যানাক্স জিনসেং সাদা (খোসা ছাড়ানো) ও লাল (খোসা সমেত) এই দুই রকম রূপে পাওয়া যায়। খোসা সমেত অবস্থায় এটি অধিক কার্যকরী। এদের মধ্যে থাকা জিনসেনোনোসাইড নামক একটি উপাদান এর কার্যক্ষমতার জন্য দায়ী। সাইবেরিয়ান জিনসেং নামে আরেক ধরণের গাছ আছে, যা জিনসেং বলে ভূল করা হলেও তা আসলে প্রকৃত জিনসেং না।

জিনসেং ও লিংগোত্থানে অক্ষমতাঃ

জিনসেং এর গুনাবলীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী যা প্রমানিত তা হলে, পুরুষের লিংগোত্থানে অক্ষমতা রোধে এর ভূমিকা। University of Ulsan এবং the Korea Ginseng and Tobacco Research Institute ৪৫ জন ইরেকটাইল ডিসফাংশন (লিংগোত্থানে অক্ষম ব্যাক্তি) এর রোগীর উপর একটি পরীক্ষা চালান। তাদের কে ৮ সপ্তাহের জন্য দিনে ৩বার করে ৯০০ মিগ্রা জিনসেং খেতে দেয়া হয়, এরপর দুই সপ্তাহ বিরতি দিয়ে আবার ৮ সপ্তাহ খেতে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে ৮০% জানান যে, জিনসেং গ্রহনের সময় তাদের লিংগোত্থান সহজ হয়েছে। ২০০৭ সনে Asian Journal of Andrology এ ৬০ জন ব্যাক্তির উপর করা এবং Journal of Impotent Research এ ৯০ জন ব্যাক্তির উপর করা অনুরুপ আরো দুটি গবেষনা প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালের একটি গবেষনায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, জিনসেং কিভাবে লিংগোত্থানে সহায়তা করে। পুরুষের যৌনাংগে corpus cavernosum নামে বিষেশ ধরণের টিস্যু থাকে। নাইট্রিক অক্সাইডের উপস্থিতিতে এই টিস্যু রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে লিংগোত্থান ঘটায়। জিনসেং সরাসরি দেহে নাইট্রিক অক্সাইডের পরিমান বাড়িয়ে লিংগোত্থানে সহায়তা করে।

জিনসেং ও দ্রুত বীর্যস্খলনঃ

যদিও কাচা জিনসেং এর মূল এই রোগে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা জানা যায়না তবে জিনসেং এর তৈরী একটি ক্রীম পুরুষদের দ্রুত বীর্যস্খলন রোধে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার হয়ে আসছে যা মিলনের একঘন্টা আগে লিঙ্গে লাগিয়ে রেখে মিলনের আগে ধুয়ে ফেলতে হয়। Journal of Urology তে ২০০০ সনে প্রকাশিত একটি গবেষনা অনুযায়ী এটি বীর্যস্খলনের সময় কাল কার্যকরী ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ভাবে বাড়ায়।

জিনসেং ও cognitive function:

cognitive function বলতে বুঝায় বিভিন্ন মানসিক ক্ষমতা যেমন মনযোগ, স্মৃতিশক্তি, কথা শোনার সাথে সাথে বুঝতে পারার ক্ষমতা,কল্পনাশক্তি, শেখার ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধি, চিন্তা শক্তি ও সমস্যা সমাধান করে কোন একটা সিদ্ধান্তে পৌছানোর ক্ষমতা। সোজা ভাষায় বলতে গেলে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি। জিনসেং স্নায়ুতন্তের উপর সরাসরি কাজ করে মানসিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ২০০৫ সনে Journal of Psychopharmacology তে প্রকাশিত গবেষনা অনুযায়ী ৩০ জন সুস্বাস্থ্যবান যুবার উপর গবেষনা করে দেখা গিয়েছে যে জিনসেং গ্রহন তাদের পরীক্ষার সময় পড়া মনে রাখার ব্যাপারে পজিটিভ ভূমিকা রেখেছিল। একই জার্নালে ২০০০ সালে করা একটি গবেষনা, যুক্তরাজ্যের Cognitive Drug Research Ltd কর্তৃক ৬৪ জন ব্যাক্তির উপর করা একটি গবেষনা এবং চীনের Zhejiang College কর্তৃক ৩৫৮ ব্যাক্তির উপর করা একটি গবেষনা অনুযায়ী জিনসেং মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধ ব্যাক্তির স্মরণশক্তি ও সার্বিক বৃদ্ধিতেও সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৫ সনে Annals of Neurology তে প্রকাশিত ইদুরের উপর করা গবেষনা অনুযায়ী জিনসেং মস্তিষ্কের কোষ বিনষ্টকারী রোগ যা স্মৃতিশক্তি বিনষ্ট করে (যেমন পারকিন্সন ডিজিজ, হান্টিংটন ডিজিজ ইত্যাদি) সেসব প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

জিনসেং ও ডায়াবেটিসঃ

২০০৮ সনে ১৯ জন টাইপ ২ ডায়বেটিস এর রোগীর উপর করা গবেষনা অনুযায়ী জিনসেং টাইপ ২ ডায়বেটিস ম্যানেজমেন্টে কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে।

জিনসেং ও কোলেস্টেরলঃ

Pharmacological Research এ ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষনা অনুযায়ী, দিনে ৬ মিগ্রা হারে ৮ সপ্তাহ জিনসেং গ্রহণ খারাপ কোলেস্টেরল যেমন- total cholesterol (TC), triglyceride (TG) ও low density lipoprotein (LDL) এর মাত্রা কমাতে ও ভালো কোলেস্টেরল (High Density Lipoprotein বা HDL) এর মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে।

জিনসেং ও ফুসফুসের রোগঃ

Chronic Obstructive Pulmonary Disease(COPD) হচ্ছে ফুসফুসের অন্যতম কমন রোগ। এই রোগীদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে কফ থাকে ও কারো কারো ফুসফুসের ক্ষয় ঘটে। Archive of Chest Disease এ ২০০২ সনে প্রকাশিত ৯২ জন রোগীর উপর করা গবেষনা অনুযায়ী ১০০মিগ্রা ডোজে ৩ মাস জিনসেং গ্রহণে সার্বিক ভাবে COPD এর অবস্থার উন্নতি হয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।

জিনসেং ও ত্বকঃ

জিনসেং বিভিন্ন এন্টি-এজিং ক্রীম ও স্ট্রেচ মার্ক ক্রীম এ ব্যবহৃত হয়। এইসব ক্রীম ত্বকের কোলাজেন এর উপর কাজ করে ত্বকের বলিরেখা প্রতিরোধ করে ও গর্ভবতী নারীদের পেটের ত্বক স্ফীতির কারণে তৈরী ফাটা দাগ নিরসন করে। তবে এটির জন্য জিনসেং এর ভূমিকা কতটুকু ও ক্রীমে থাকা অন্যান্য উপাদানের ভূমিকা কতটুকু তা জানা যায়নি।

জিনসেং ও আরো কিছু রোগঃ

মেয়েলি হরমোন বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বৃদ্ধি ও শক্তি বর্ধক এনার্জি ড্রিংক হিসেবে জিনসেং দারুন কার্যকরী। জিনসেং রক্ত তরল করে স্ট্রোক প্রতিরোধ করে। আরো কয়েকটি রোগ নিরসনে জিনসেং ভূমিকা রাখে বলে লোকজ ব্যবহার হতে জানা গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই রোগ গুলোর ক্ষেত্রে গবেষনা করে জিনসেং এর কার্যকরীতা অস্বীকারও করেন নি আবার নিশ্চিত ভাবে মেনেও নেননি। এইসব রোগের মধ্যে আছে, সরদি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ক্যান্সার (পাকস্থলি, ফুসফুস, যকৃত, ত্বক, ডিম্বাশয়), রক্তশূণ্যতা, বিষন্নতা, পানি আসা, হজমে সমস্যা ইত্যাদি।

ব্যবহারবিধিঃ

পূর্নবয়স্করা ৮ সপ্তাহ টানা জিনসেং খেয়ে ২ সপ্তাহ বিরতি দিয়ে আবার খেতে পারবেন। যেহেতু এটি একটি অতি কার্যকরী ওষুধ, তাই দীর্ঘদিন ব্যবহারের কোন রকম ক্ষতি হতে পারে ভেবে এটি বেশিদিন ব্যবহার করতে মানা করা হয় (যদিও দীর্ঘ ব্যবহারে ক্ষতির কথাটার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই).. তবে জিনসেং সাধারণত ট্যাবলেট, পাউডার, ড্রিঙ্কস হিসেবে খাওয়া হয়, এবং এদের গায়েই ব্যবহারবিধি লেখা থাকে। পাউডার এর জন্য ডোজঃ মানসিক ক্ষমতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শক্তি বা স্ট্যামিনা বৃদ্ধি ও ডায়বেটিস এর জন্য এর ডোজ হলো ২০০ মিগ্রা পাঊডার করে দিনে ৩ বার ও লিংগ উত্থান এর জন্য ৯০০ মিগ্রা পাউডার করে দৈনিক ৩ বার। সরাসরি মূল খেলে ১-২ গ্রাম মুল খাওয়া যাবে দৈনিক ১ বার।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ

জিনসেং এর সবচেয়ে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিকৃয়া হলো ঘুমের সমস্যা। আগেই বলেছি, জিনসেং স্নায়ুতন্ত্র কে উত্তেজিত করে ও মানসিক ক্ষমতা বাড়ায়। উত্তেজিত স্নায়ুর কারণে ঘুম আসতে দেরি হয়, যেমন টা হয় কফি খাওয়ার পরে। অন্যান্য সাধারণ সমস্যার মধ্যে আছে ডায়রিয়া, মাথাব্যথা, হার্ট বিট বাড়া এবং ব্লাড প্রেশারে তারতম্য হওয়া (সাময়িক)।

যারা খাবেন নাঃ

বাচ্চা, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের এটা খেতে নিষেধ করা হয়। জিনসেং স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে তাই স্নায়ুর উপর কাজ করে এমন অন্য কোন ওষুধ (যেমন ঘুমের অষুধ, বিষন্নতার ওষুধ ইতাদি) এর সঙ্গে এটা খাওয়া উচিত না, নয়ত স্নায়ু অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে যাবে। জিনসেং রক্ত জমাট বাধা প্রতিরোধ করে, তাই হার্টের রোগীরা যারা ইতমধ্যে রক্ত তরল করার অন্যান্য ওষুধ ( যেমন heparin and warfarin) খাচ্ছেন, তারা এদের সঙ্গে জিনসেং খাবেনা না। জিনসেং ব্লাড সুগার কমাতে সহায়তা করে, তাই ডায়বেটিস রোগীদেরো ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে এটা খাওয়া উচিত যাতে ওষুধের সাথে জিনসেং গ্রহণে সুগার যেন বেশি কমে না যায়। অতিকর্মক্ষম রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে কিছু রোগ হয়, যেমন multiple sclerosis (MS), lupus (systemic lupus erythematosus, SLE), rheumatoid arthritis (RA) এদের বলা হয় Auto-immune disease। জিনসেং যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় তাই সাধারণ মানুষ এতি খেলে উপকৃত হবে কিন্তু Auto-immune disease এর রোগীদের খাওয়া উচিত না। জিনসেং মেয়েলি হরমোন ইস্ট্রোজেন এর পরিমাণ বাড়ায়, তাই যাদের হরমোনের সমস্যা আছে তাদের এটা খাওয়া উচিত কিন্তু যাদের ব্রেস্ট, জরায়ু বা ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার আছে তাদের খাওয়া উচিত নয় কারণ অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন এইসব ক্যান্সারে আরো সহায়ক ভূমিকা রাখে। জিনসেং ব্লাড প্রেশারেও তারতম্য ঘটায় তাই হাই ও লো প্রেশারের রোগীদেরো নিয়মিত খাওয়া উচিত না। সোজা ভাষায় বলতে গেলে, জিনসেং এর ভালো গুনগুলোর কারণেই আসলে একে সতর্ক ভাবে গ্রহণ করা উচিত।

লেখক- Md. Rokonul Islam Chowdhury

Get in Touch

spot_imgspot_img

Related Articles

spot_img

Get in Touch

0FansLike
1,838FollowersFollow
0SubscribersSubscribe

Latest Posts