কোটি টাকার আগর


সিলেটকে একসময় বলা হতো আগরের স্বর্গরাজ্য। পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত সিলেটের আগরের ওপর নির্ভরশীল ছিল সারাবিশ্ব। দীর্ঘদিন থেকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আগরকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া, জটিল রপ্তানি প্রক্রিয়া ও কারখানায় জ্বালানি সংকটের কারণে বহির্বিশ্বে সম্ভাবনাময় এ পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে আসতে থাকে। তবে গত এক দশক থেকে আগর বনায়নে বন বিভাগ এগিয়ে আসায় নতুন করে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগেও আগর বনায়ন করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট দূর করা গেলে বছরে শতকোটি টাকার আগর রপ্তানি করা সম্ভব।

বনবিভাগ সূত্র জানায়, দেশের ১২১টি আগর কারখানার সবকটিই সিলেট বিভাগে অবস্থিত। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ১১১টি, কুলাউড়ায় ৬টি, কমলগঞ্জে ২টি ও সিলেট সদরে ২টি কারখানা রয়েছে। বড়লেখার সুজানগরকে বলা হয় আগরের রাজধানী। এ অঞ্চলের আগর খুবই উন্নতমানের হওয়ায় বহির্বিশ্বে এর কদরও ছিল বেশি। কাঁচামাল সংকট ও কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ না থাকায় ৫০-এর দশক থেকে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। আগর উৎপাদনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা না দেওয়ায় ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় উদ্যোক্তাদের। ফলে আগর চাষ ও আগর থেকে আতর উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় এ রপ্তানি খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে ১৯৯৮ সালে বনবিভাগ বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়। এর আওতায় সিলেট বিভাগে ৭৮৫ দশমিক ৬৭ হেক্টর জমিতে আগর বাগান গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় চাষিদেরও উৎসাহিত করা হয় আগর বনায়নে। আগরের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে বনবিভাগ প্রতি বছর ১ লাখ ২০টি আগর চারা বিতরণ করে আসছে।

আগর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সিলেটের বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত আগর প্রক্রিয়াজাত করে চিপস (গাছের ভেতরের অংশ) ও তেল (আতর) আকারে বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। সিলেটের আগরের সবচেয়ে বড় বাজার এখন মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এ ছাড়া ভারত, সিঙ্গাপুর ও জাপানেও আগর রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে আগরকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় বছরে কি পরিমাণ আগর রপ্তানি হয় এর কোনো পরিসংখ্যান নেই।

আগর ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি আগর কাঠ (চিপস) মানের তারতম্য অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এসব আগর কাঠের বর্তমান বাজারদর প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ১০০ ডলার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত। এ ছাড়া প্রতি কেজি আগর তেল (আতর) সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। আগর তেল (আতর) উৎপাদন কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে ‘চিপস’ রপ্তানি করে থাকেন। বছরে এ রপ্তানির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিস্ট ব্যবসায়ীদের ধারণা।

মধ্যপ্রাচ্যে আগর রপ্তানিকারক বড়লেখার সুজানগরের ইসমাইল মিয়া জানান, বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত আগর তেল সৌদি আরবে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি ও ইউনানী ওষুধ তৈরি করা হয়।

সুজানগরের বেঙ্গল পারফিউমারির স্বত্বাধিকারী আবদুল কুদ্দুছ বলেন, সিলেটের আগর নিয়ে কোনো গবেষণা না হওয়ায় বাগান সম্প্র্রসারণ হয়নি। ফলে আগর কারখানাগুলোতে কাঁচামাল সংকট রয়েছে। কাঁচামালের অভাবে বছরের অর্ধেক সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। আগরের মান নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার জন্য এ অঞ্চলে আগর-আতর গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মৌলভীবাজারের রপ্তানিকারক আনসারুল হক বলেন, আগরকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় আগর ও আতর রপ্তানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। অন্যান্য গাছের মতো আগর গাছ পরিবহনেও বনবিভাগের টিপির (ট্রানজিট পারমিট) প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া আগরকে সাইটিস (কনজারভেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব এনডেঞ্জার স্পেসিস অব ওয়াইল্ড ফ্লোরা অ্যান্ড ফোনা) তালিকাভুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করায় এ গাছ তার অংশ বিশেষ করে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিতে প্রধান বন সংরক্ষকের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব ছাড়পত্র গ্রহণ সময়সাপেক্ষ ও জটিল বলে দাবি করেন তিনি।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল বাসার জানান, আগর ও আতর বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি রপ্তানি পণ্য। আগর বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দেওয়া সম্ভব। আগর চাষাবাদের জন্য সিলেট বিভাগকে সবচেয়ে উপযোগী অঞ্চল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগর চাষাবাদে লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করতে বনবিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। বনবিভাগের সহযোগিতায় অনেকেই আগর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সরকারি উদ্যোগেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আগর চাষাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

0