জাতীয় এসএমই পুরস্কারের আবেদন শুরু হয়েছে


 

সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলো এসএমই ফাউন্ডেশন।  এটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়। দেশের ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে এবং তাদের সহায়তা করতে কাজ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের উৎপাদনমুখী কার্যক্রমকে সহজ করার লক্ষে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিজ থেকে কোনো ঋণ দেয় না। তারা গ্রাহককে ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়, যাতে গ্রাহক সহজে ব্যাংক থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পেতে পারেন।

যার ফলে ক্ষুদ্রে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসার প্রসার করতে পারে এর সাহায্যে।  অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে এসএমই’র গুরুত্ব অপরিসীম। বেশিরভাগ  শিল্পোন্নত দেশগুলোর অধিকাংশই এসএমই খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পোন্নয়নের যাত্রা শুরু করেছিল। একই ভাবে বাংলাদেশের জনগণের জীবনমানের গুণগত পরিবর্তনের জন্য টেকসই এসএমই খাতের বিকাশ জরুরী।

ক্ষুদ্র এবং মাঝারী শিল্পের বিকাশে এবং মান উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশন একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারী শিল্প উদ্যোক্তা এবং বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচী আয়োজন করে থাকে। দেশের ক্ষুদ্র এবং মাঝারী শিল্প যাতে দেশের দারিদ্র্যতা নিরসনে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারে সেজন্য এসএমই ফাউন্ডেশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। ২০০৭ সালে ৩০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটি একটি স্বাধীন এবং অলাভ জনক প্রতিষ্ঠান।

দেশীয় অনেক শিল্প  উদ্যোক্তা তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে তাদের ব্যবসা ও উপার্জন দিয়ে আমাদের দেশ কে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমই উদ্যোক্তার অবদান ও অংশগ্রহণকে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃতি দেয়া এবং তাঁদেরকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন জাতীয় পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরুস্কার প্রদান করে থাকে। প্রতি বছরই এই আয়োজন করা হয়।

২০১১সাল থেকে ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ‘চাকরি খুঁজবো না, চাকরি দেব’ নানা ধরনের উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছে। এই গ্রুপের সাথে জড়িত অনেকেই এখন অনেক ধরনের ছোট-বড় নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করছে। তাদের মধ্যে অনেকেই পাচ্ছেন তাদের উদ্যোগের স্বীকৃতি। এদের মধ্যে একজন হলেন ‘কুসুম কলির’ নাজমা খাতুন।

বাংলাদেশের আর দশজন নারীর মতোই তার বিয়ে হয়ে যায় খুব অল্প বয়সেই। এরপর কোলের সন্তানকে সাথে নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। প্যারামেডিকসের ডিগ্রিও শেষ করেন। এরপর ছা-পোষা চাকরি করতে তার ভালো লাগছিল না। নিজ উদ্যোগে কিছু করার আগ্রহ তার অনেক দিন থেকেই ছিল এরপর সাহস করে ২০০৫ সালে এক জুতার কারিগরের পরামর্শে বাসার সেলাই মেশিনটি পরিবর্তন করে সূচনা করেন কুসুমকলির। দেড় বছর শেষে বুঝতে পারেন, বাজারে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেনা আর জুতা বানানোর জ্ঞান ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয়নি। ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকার ঋণ নিলেন আর সেখান থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পুরোনো ঋণ শোধ করলেন। ৪০ হাজার টাকা হাতে নিয়ে নামলেন মাসে কমপক্ষে ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায়ের সংগ্রামে। এবার আর ভুল করলেন না। নিজেই নামলেন উৎপাদনে, কারখানার কর্মীদের সঙ্গে নিজেই হয়ে গেলেন কর্মী। প্রতিদিন ৪৮ জোড়া জুতা তৈরি করে সেটি সন্ধ্যাবেলায় তুলে দিতেন স্বামী মিজানুর রহমানের হাতে। মিজানুর রহমান সেটি বিক্রি করে পরদিনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরতেন!

এরপর অনেক চরাই-উৎরাই করে বর্তমানে লতিফপুরে নিজের ১০ শতাংশ জমির কারখানায় কাজ করেন ১৩০ জন কর্ম। নাজমা খাতুনের গাজীপুরের কারখানার জুতা দেশের বাইরে বিক্রি হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। নিয়মিত রপ্তানী করছেন। তার এই অসাধারন উদ্যোগ এর জন্য ২০১৭ সালে  ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ -এর পক্ষ থেকে নাজমা খাতুনকে সম্মানিত করা হয় ইউসুফ চৌধুরী সম্মাননায়।

এরপরই নাজমা খাতুন পান জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০১৯।

আরো একজন উদাহারন হলেন এফ এম প্লাস্টিক  এর মোঃ গাজী তৌহিদুর রহমান। ২০০৭ সালে ডিসপোজেবল প্লাস্টিকের কথা জানতে পারেন । এরপর  চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন  স্বচ্ছ প্লাস্টিকের যা যা বানানো যায়, ব্লিস্টার প্যাকেজিং , মোবাইলের ব্যাটারি, চার্জার, মাজুনির কাভার –তার ব্যবসা। তারপরই পাওয়া গেল ইউনাইটেড এমিরেটসের ১ লক্ষ ডিস কাভার তৈরির কাজ। ব্যাস ঘুরে দাড়ালেন  তৌহিদ। লালবাগ, কামরাঙ্গীর চরে ভাঁড়া নিয়ে শুরু হলো নিজের কারখানা। এখন নরসিংদীতে তার  বিশাল ফ্যাক্টরি। কাজ করে ২০০+ লোক। হেন কোন কোম্পানি নেই যার জন্য প্লাস্টিক সামগ্রী বানায় না তিনি। বাজারেও তার অনেক সুনাম। বিনিয়োগকারীরাও সঙ্গে আছে। ২০১৬ সালের   ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ -এর পক্ষ ইউছুফ চৌধুরী সম্মাননা পেয়েছে উদ্যোক্তা হিসাবে।তিনিও ২০১৮ সালে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার পান।

জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে যে সকল এসএমই উদ্যোক্তা তাদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও মননশীলতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের দ্বার উম্মোচন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আর্থিক নৈপূণ্য প্রদর্শন, পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে সে সকল এসএমই উদ্যোক্তার সাফল্য গাঁথার চিত্র তুলে ধরা এবং সার্বজনীন স্বীকৃতি প্রদান করা।

দেশের পুরুষ ও নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনটি ক্যাটাগরিতে ছয়টি পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে। ক্যাটাগরিসমূহ:
ক) বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা (পুরুষ-১, নারী-১)
খ) বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (পুরুষ-১, নারী-১) এবং
গ) বর্ষসেরা মাঝারি উদ্যোক্তা (পুরুষ-১, নারী-১)।

২০২০ সালের জন্য জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার এর আবেদন ফর্ম ছাড়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা এখন থেকেই আবেদন করতে পারবে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার এর জন্য।

 

 

 

 

 

0