ব্যবসা ‘কেন’ দিয়েই শুরু করুন: সাইনক সিনকের ‘গোল্ডেন সার্কেল’ এর ভিতর বাহির


ট্রাম্পের মত এক পাগলাকে আমেরিকার লোক প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন- কারণ ট্রাম্প আমেরিকানদের প্রত্যাশার মাঝে সেরা ‘কেন’ তা ধারণ করে বলেই চলছিলেন ‘Make America Great Again’। আমেরিকাকে গ্রেট বানানোর এই Why দিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে এসেছেন। বড় ব্যান্ড হয়ে উঠতে গেলে এই ‘Why’ নিয়ে ভাবতে হবে উদ্যোক্তাদের।

এই বিষয়ে ব্যবসায়ের অনেকগুলো বিষয়ের মাঝে কি, কিভাবে এবং কেন নিয়ে তত্ত্ব দিয়েছেন সাইনক সিনক যা ‘গোল্ডেন সার্কেল’ তত্ত্ব নামে পরিচিত। প্রাক্তন বিজ্ঞাপন নির্বাহী ও লেখক সাইনক সিনক বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ও প্রভাবশালী নেতাদের সাফল্যের বিষয়ে গবেষণা করেছেন এবং তিনি দেখেছেন যে কোম্পানি এবং নেতারা কীভাবে ভাবে, কি কাজ করে, কোন পদ্ধতিতে ক্রেতাদের সাথে সংযোগ ঘটায় এবং তাদের সফলতার কারণ কী। এই গবেষণা শেষে তিনি বলছেন, মানুষ উদ্দেশ্যের Why ধারনা দ্বারা অনুপ্রাণিত। তিনি মনে করেন ব্যবসায়ে ‘কেন Why’ ধারণাটি ‘কিভাবে (How) এবং ‘কী (What)’ এর আগে আসা উচিত। এই তিনটি বিষয়কে নিয়ে ‘সোনালী বৃত্ত’-তে তিনি দেখিয়েছেন যে, পৃথীবির সকল লোক জানে যে সে ‘কি’ করছে, কোন পদ্ধতিতে বা কোন উপায়ে কাজ করছে বা ব্যবসা করছে অনেক লোক সেটাও জানে। কিন্ত কেবল অল্প কিছু লোক জানে যে ‘কেন’ এই কাজটা সে বা তারা করছে। ‘কেন’ দিয়ে এখানে ফলাফল, টাকা পয়সা, মুনাফা বা বড় হওয়ার মত জিনিসকে বোঝান নি তিনি। এই ‘কেন’ দিয়ে ব্যবসায়ের বা লোকের লক্ষ্য বা কারণের উপরে ফোকাস করেছেন, মানুষের ভিতরের তাড়না বা পণ্যের USP (Unique Selling Proposition) বুঝিয়েছেন।

‘কেন’ দিয়ে তিনি বের করার চেষ্টা করেছে- মানুষ কেন কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করবে, তার মাঝে নতুন কি আছে, মানুষ কেন তার পণ্য কিনবে, কেন ব্যবসাটা দিনের পর দিন এগিয়ে যাবে ইত্যাদি? ছোট বা বড় উদ্যোক্তাকে তাই ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর ভিতরে ধারন করে বাহিরের দিকে (‘কিভাবে’ এবং ‘কি’ এর দিকে) আসতে হবে।

এইসব অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণেই ‘কেন’ বৃত্তটিকে তিনি কেন্দ্রে রেখেছেন। তিনি বলেছেন ‘কেন’ মানুষের উদ্দেশ্য বা উদ্দেশ্যগুলি প্রতিনিধিত্ব করে। এই কেন দিয়েই বড় বড় ব্র্যান্ড এখন রাজত্ব করে চলছে। ‘কেন’ যেহেতু মানুষের বিশ্বাসের সাথে জড়িত তাই এই ‘কেন’কে উদ্যোক্তাকে বিশ্বাস করতে হবে, ধারণ করতে হবে। অনেকটা মহানবী (সাঃ) এর কাছে আসা মহিলার বাচ্চার চিনি খাওয়া বন্ধ করার ঘটনার মত। মহানবী (সাঃ) নিজে চিনি খাওয়া বন্ধ রেখে বাচ্চাকে ৩য় দিন চিনি খেতে নিষেধ করেছিলেন যা ‘Why’ এর অনেক বড় উদাহরণ। প্রযুক্তি লিডার অ্যাপেল ও শুরু করেছে ‘Why’ দিয়ে। অন্যান্যদের মত কম্পিউটার ও ফোন বানায় তারা। কিন্তু ক্রেতারা অ্যাপেল কেনে কেন? Everything we do, we believe in challenging the status quo. We believe in thinking differently–আমরা যা কিছু করি, আমরা স্ট্যাটাসকে চ্যালেঞ্জ করতে বিশ্বাস করি। আমরা ভিন্নভাবে চিন্তায় বিশ্বাস করি- এটাই অ্যাপেল পণ্যের অবস্থান এবং ভোক্তাদের কেনার মুল ব্যাখ্যা।

সাইমন সাইনকের এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সাথে মানুষের মস্তিষ্ক এবং বিভিন্ন স্তরের ক্রেতাদেরও যোগসুত্র আছে। গোল্ডেন সার্কেল তত্ত্বের বৃত্তের সাথে মানুষের মস্তিষ্কের গঠনকে বিবেচনা করেছেন তিনি। মস্তিস্কের বাইরের বৃত্ত হল Neocortex। এখানে আমরা যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করি এবং ভাষা দিয়ে তা প্রকাশ করি। ২য় ভাগে Limbic মস্তিষ্ক- আমাদের বিশ্বাস, আনুগত্য, অনুভূতি,আচরণ এর জন্য দায়ী। এইখানেই ‘কিভাবে’ এবং ‘কেন’ বাস করে।

এই লেভেলের নিজের ভাষা বা শব্দের ক্ষমতা নেই। এ কারণে বিশ্বের প্রথমসারির কোম্পানিগুলো ‘কি’ প্রশ্নের পরিবর্তে মূল প্রশ্ন ‘কেন’ থেকে শুরু করে। তারা মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশটিকে লক্ষ্য করে এবং তারা জানে যে তাদের সম্ভাব্য গ্রাহকেরা তাদের সিদ্ধান্তকে যুক্তিযুক্ত করবে ‘কেন’ দিয়েই। তবে এই ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে তাদের বিশ্বাস ধারণ করে তা ক্রেতা বা ভোক্তাদেরকে সফলভাবে জানিয়ে সুন্দর সম্পর্ক তৈরীতে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্ত-কর্মচারীরা তাদের নিজের অফিসের পণ্য ব্যবহার করে, পরিবারের জন্যে কেনে এবং অন্যদেরকে উপহার দেয়। গল্পের মাঝে নিজের কোম্পানির পণ্য ‘কেন’ সেরা সেটা ব্যাখ্যা করে।

এখানে আরও একটা মজার বিষয় আছে। বাজারে নতুন পণ্য আসলে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ের ৫টি স্তরে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশে যখন উবার বা পাঠাও শুরু হল তখন মাত্র অল্প কিছু লোক ব্যবহার শুরু করেছিল- সেই ক্রেতাদেরকে বলা হয় ‘Innovators’- এরা অন্যদের থেকে আলাদা হতে চায়। সবাই যা ব্যবহার করে তার প্রতি এদের আগ্রহ কম। টাকা এদের কাছে বড় কোন ঘটনা না। পরের ভাগে রয়েছে ‘Early Adopters’ গ্রুপ- এরা মূলত সমাজের প্রথম শ্রেণীর লোক, এরা মতামত দেয়, সমাজ চালায়, সমাজ বদলে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। ‘Early Majority’ ভোক্তা গ্রুপ আমজনতার চেয়ে নিজেকে আলাদাভাবে দেখে। কোন পণ্য মার্কেটে এলে এরা একটু সময় নেয়। একটা দুইটা রেফারেন্স পেলে নিজেরাও কিনে ফেলে।

এত কথা বলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘Why’ দিয়ে যারা ব্যবসা শুরু করে তাদের পণ্য বা সেবা ‘Innovators’ এবং ‘Early Adopters’ ভোক্তা গ্রুপ অন্যান্য কোম্পানির পণ্য বা সেবার চেয়ে দ্রুত পছন্দ করা শুরু করে। কারণ তারা নতুনের সন্ধানেই থাকে। এরা কোন পণ্য গ্রহণ করলে তা তুলনামূলকভাবে দ্রুত Early Majority গ্রুপের হাত ধরে Late Majority গ্রুপের কাছে পৌঁছায় এবং শেষে Laggards শ্রেনী থেকেও কিছু ক্রেতা তারা পেয়ে যায়। এভাবে একটা টেকসই পণ্য বাজারে টিকে যায় এবং নেতৃত্বে চলে আসে।

তবে মনে রাখা দরকার ব্যবসায়ে একেরাবে নতুন ‘Why’ পাওয়া সহজ বিষয় না। সর্বদা নতুন পণ্য দিয়েই শুরু হবে তার কোন মানেও নেই। কিছুটা আলাদা বা বৈচিত্র দিয়েও ‘Why’কে গ্রহনযোগ্য করে তোলা যায়। বাংলাদেশে রকমারি, যান্ত্রিক, সেবা এক্সওয়াইযেড, খাসফুড, কুকসআপ নতুন ধারনা নিয়ে অনলাইন ব্যবসা শুরু করলেও সহজ, আজকের ডিল, অথবা ইত্যাদি ব্যবসাগুলো কিছুটা আলাদাভাবে, কিছুটা বৈচিত্র্য এনে এই ‘Why’কে ক্রেতাদের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তুলেছে।

তাই যদি কোনও কোম্পানি সফল হতে চায় তবে তাদের ‘কেন’ ব্যাপারটিকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত যেন তা ভোক্তাদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পায়। এই গ্রহনযোগ্যতা পাবার ক্ষেত্রে নিত্য নতুন সেবা ও পণ্যের গুনাবলী যোগ করা উচিত আর অন্য কারও প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার আগে কোম্পানির তার নিজস্ব প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া উচিত। এভাবে কোম্পানিটি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে এবং বাজারে প্রভাবশালী ব্র্যান্ডের মধ্যে একটি হতে পারবে।

মির্জা মুহাম্মদ ইলিয়াস, প্রধান ব্র্যান্ড কৌশলী, ব্র্যান্ডগিয়ার।

0