শুদ্ধ কৃষির শুদ্ধতা!


শুদ্ধ কৃষি, একটি কৃষি উদ্যোগ। উদ্যোক্তা কাকলী খান। বিডিওএসএন এর উদ্যোক্তা গ্রুপ ‘চাকরি খুঁজবো না, চাকরি দেবো’ প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি এবছর উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। কাকলীর শুদ্ধ কৃষি উদ্যোগের শুরুটা হয় পরিবারের সদস্যদের জন্য রাসায়নিক ও বিষমুক্ত খাবার সংগ্রহের তীব্র তাগাদা থেকে। প্রায় আটবছর আগে কিডনিজনিত রোগে কাকলীর ফুপু মারা যান। সেসময় চিকিৎসক জানিয়েছিলেন কিডনি রোগসহ আমাদের আরো অনেক রোগের প্রত্যক্ষ কারণ খাবারে রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি। বিষয়টি প্রবলভাবে কাকলীর মাথায় ঢুকে যায়। এরপর থেকে নিজ এলাকা কুষ্টিয়ার পরিচিত কৃষক যারা জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করেন তাদের কাছ থেকে নিজ পরিবারের জন্য খাদ্য পণ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

নিয়মিত এভাবেই চলতে থাকলে উদ্যোগটা আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রশংসা পায়। একপর্যায়ে পরিচিতজনরা তাদের জন্যেও অর্গানিক খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করে দেয়ার আবদার করতে থাকেন। সেই আবদারের ফলাফলই আজকের শুদ্ধ কৃষি। তবে উদ্যোগ শুরু করলেই তো আর হলো না! কাজটা এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু কেমনে করবে, কাকলী শুদ্ধ কৃষির ওয়ান ম্যান আর্মি! লোকবল নেই। সচরাচর প্রতিটা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে যা হয় আর কী! তবে উদ্যোম আর নিষ্ঠা থাকলে শেষমেশ সবই সম্ভব। তাইতো চলার পথে সহযোগি হিসেবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা নানাভাবে এগিয়ে এসেছে। আমাকে পারতেই হবে এই আত্মবিশ্বাসে ভর করে কাকলী সারাদেশ ছুটে বেড়িয়েছে-এখনো বেড়ায়, খুঁজে বের করেছে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা কৃষকদের, এমনকি বাড়ির উঠানে সবজি চাষ করা গ্রামীন নারীদেরও।

উঠোনে চাষ করা সবজির মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকীটা শুদ্ধ কৃষি আউটলেটে সরবরাহ করে প্রচুর নারী নিজেদের হাতখরচের টাকা জোগাড় করতে সমর্থ হয়েছে। শুদ্ধ কৃষি উদ্যোগের একেবারে শুরুতে কাকলী সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই অর্গানিক কৃষিপণ্য উৎপাদন করবেন এবং ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করবেন। এই ভাবনা থেকেই কুষ্টিয়ায় এক আত্মীয়ের গ্রামে খামার করেছিলেন কাকলী তবে বছরখানেকের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে চুয়াডাঙ্গায় তার মামার বাড়িতে আরও একটা খামার করেন। ঢাকা থেকে খামার মেইনটেন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা সুতরাং সেটাও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। বারবার বাধার মুখে পরলেও হতোদ্যম হননি। ছুটে গেছেন বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন জেলায়। ৩৭টি জেলার কৃষকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তার শুদ্ধ কৃষি নেটওয়ার্ক। সেসব জেলার খামারিদের কাছ থেকে নিয়মিত কৃষিপণ্য। চলে আসে ঢাকায়। এছাড়া ঢাকার খুব কাছেই কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে নিজেও ১২ বিঘা জমির ওপর একটা খামার গড়ে তুলেছেন কাকলী। এই খামার থেকে নিয়মিত সবজি আসে ‘শুদ্ধ কৃষি’র বিক্রয়কেন্দ্রে।

রাজধানীর গ্রিন রোডে অবস্থিত কমফোর্ট হাসপাতালের অপোজিটে এবং ধানমন্ডি ক্লিনিকের নিচতলায় ‘শুদ্ধ কৃষি’র বিক্রয়কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এখানেই বিক্রি করা হয়। এছাড়া গুকশা ও ধানমন্ডীর ইউনিমার্টে শুদ্ধ কৃষির কর্ণার আছে। সেখান থেকেও ভোক্তারা পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন। রাসায়নিক মিশ্রিত ও ভেজাল খাবারের ভিড়ে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতেই কাকলীর এই উদ্যোগ। শুক্র ও মঙ্গলবার হচ্ছে ‘শুদ্ধ কৃষি’র হাটবার। এই দুই দিন গ্রামের হাটের মতোই এখানে মাছ, মাংস, সবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে নানারকম কৃষিপণ্য থাকে। শুদ্ধ কৃষির বিক্রয়কেন্দ্রটি খোলা থাকে সপ্তাহের সাতদিনই। উদ্যোগ হিসেবে কৃষিকে বেছে নেয়া নারীর সংখ্যা আমাদের দেশে হাতে গোনা। আবার সেটা যদি হয় অর্গানিক পণ্য তাহলে তো চ্যালেঞ্জ আরো বেশি। কাকলী ঠিক সেই জায়গায় নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন যে তিনি সফল।

শুভকামনা কাকলী খান!

 

 

0