ই-এশিয়া থেকে ই-কুরিয়ার


২০১০ সালের ১০ অক্টোবরকে বলা হয়েছে বাইনারি দিবস। কারণ এটিকে লেখা যেতো ১০/১০/১০ হিসাবে। সে সময় ডিজিটাল ব্যাপারটাকে জনপ্রিয় করার জন্য আমরা এরকম প্রায় প্রতিটি উপলক্ষকে কাজ লাগাতাম। বেসিস ও গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি যৌথভাবে এই দিনটি পালন করে। ছিল শোভাযাত্রা, খাই-দাই, আনন্দ আড্ডা, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং একটি আলোচনা। ঢাবির কার্জন হলেই আমরা এটা করেছি। সে সময় বেসিসের সভাপতি ছিলেন ডেটাসফটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। এ কাজ করতে গিয়ে আমার টিমের সঙ্গে প্রথম সখ্যতা হয় বিপ্লব ঘোষ রাহুলের। বিপ্লব তখনও ভার্সিটির বৈতরনী পার হয়নি। ছাত্রাবস্থায় তাঁর এই চাকরি করা।
সেই বছরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মুখ্যসচিব শ্রীলংকাতে ই-এশিয়া নামে একটি সম্মেলনে যোগ দেন এবং সেখানে গিয়ে ঘোষণা করে আসেন ২০১১ সালে বাংলাদেশ ই-এশিয়ার হোস্ট হবে।
২০১১ সালে তাই শুরু হয় ই-এশিয়ার কাজ। সে সময়কার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) হয় বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ। সেই সময়কার মাননীয় বিজ্ঞান,প্রযুক্তি ও আইসিটি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে আমাকে ই-এশিয়ার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হয়। বিসিসিতে একটা সচিবালয় গড়া হয়। একদল কর্মীকে নিয়োগ করা হয় যার টিম লিডার ছিল এখনকার ঢুলীর উদ্যোক্তা লুশা মির্জা। কথা হয় বেসিস, বিসিএস ও আইএসপিএবি – এই তিন আইসিটি সংগঠন তিনজন কর্মীকে দেবে সচিবালয়ে। আর সেই হিসাবে বেসিস থেকে আসে আমাদের বিপ্লব। সেবারই বিপ্লবের সঙ্গে আমার কাজ করার শুরু। পরের বছরই করা হয় ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এবং যথারীতি সেটাও আমার ঘাড়ে পড়ে। তখন আবার বিপ্লব এসে যুক্ত হয় আমার সঙ্গে। বিপ্লব ততোদিনে ইস্ট ওয়েস্টের স্নাতক হয়ে সেখানেই এমবিএ করছে।
এবারে কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিপ্লব আমার সঙ্গে আলাপ করতো একটি জটিল বিষয় নিয়ে। বিষয়টা জটিল কিন্তু একদিক থেকে সহজ। ততোদিনে আমাদের দেশে অনেক কুরিয়ার সার্ভিস আছে – এসএ পরিবহন, সুন্দরবন। সেগুলো দিয়ে ম্যালা কিছু এদিক সেদিক পাঠানো যায়। কিন্তু ডেলিভারী হলো কিনা, কোন ঝামেলা হলো কিনা এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানার কোন বুদ্ধি নেই। ডেলিভারি হলে আপনি প্রাপককে ফোন করে কেবল জানতে পারবেন। অথবা আপনি এসএ পরিবহনের অফিসে গেলে ওরা আপনাকে বালাম বই দেখে একটা কিছু বলতে পারবে।
বিপ্লবের কথা হলো ডিএইচএল, ফেডএক্সে আমরা যখন কোন কিছু পাঠাই তখন এটির একটি ট্র্যাকিং নম্বর থাকে। সেটা দিয়ে ওয়েবসাইটে অনায়াসে জেনে নেওয়া যায় পার্সেল কই আছে। বিপ্লবের ইচ্ছে সে এরকম একটি কুরিয়ার সার্ভিস করবে।
তো, আমার আর বিপ্লবের আলাপের বড় অংশ জুড়ে থাকে এই ডিজিটাল কুরিয়ার, এ ব্যবসার নানাদিক। যেমন আমরা চট করে সরে আসলাম ওয়েবসাইট থেকে। আমরা ভাবলাম ট্র্যাকিংটা মোবাইল থেকেও করতে পারতে হবে। শুরু হলো বিপ্লবের সফটওয়্যার বানানোর কাজ।
আর আমি আর বিপ্লব ভাবছি কোথা থেকে শুরু করা যাবে। এর মধ্যে কিন্তু ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড শেষ। বিডিওএসএন থেকে “চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব” প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আমিও নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজে নেমে পড়েছি।
বিপ্লবের চিন্তা ছিল তাঁর ই-কুরিয়ার হবে ম্যানেজ সার্ভিস। মানে কুরিয়ার সেবা ও দেবে না, প্রতিষ্ঠিত কুরিয়ারদের ট্র্যাকিং সার্ভিস দেবে। ও হ্যা, ততোদিন আমরা বিপ্লবের উদ্যোগের নাম ঠিক করে ফেলেছি। বিপ্লবের কথা শুরু হলো একটি বড়সড় কুরিয়ার কোম্পানির সঙ্গে। আমার সঙ্গে প্রতিদিনই তাঁর কথা হয়। শওকত ভাই-এর বিডিভেঞ্চারও তখন কাজে নেমেছে। কাজে বিডিভেঞ্চারের সঙ্গেও কথা হচ্ছে।

কুরিয়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ শুরু করার পর দেখা গেল স্বতন্ত্র পার্সেলের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক পার্সেলের সংখ্যা শতগুণ বেশি। মানে ঢাকা শহরে প্রতিদিন যতো লোক ব্যক্তিগত পার্সেল এদিক ওদিক পাঠায় তার তুলনায় কয়েকটা কোম্পানি অনেক বেশি পার্সেল পাঠায়। এইট্টি-টোয়েন্টি রুল আর কি।

কাজে বিপ্লবের প্রথম চিন্তা স্বতন্ত্র পার্সেল থেকে বিটুবি, বিটুসিতে গিয়ে ঠেকে। এ সময় ফেসবুককে কেন্দ্র করে নতুন একদল উদ্যোক্তা এফ-কমার্স শুরু করেছে। ই-কমার্সও ডানা মেলতে শুরু করে। তাদের ডেলিভারী সমস্যা। সমস্যা দুইটা –

  • অর্ডার পাওয়ার পর ডেলিভারির জন্য উদ্যোক্তাকে প্যাকিং করে সেটা কুরিয়ারের অফিসে পৌঁছে দিতে হয়।
  • ডেলিভারি হওয়ার পর কুরিয়ার কোম্পানির কাছ থেকে আবার ক্যাশ ইন ডেলিভারির টাকা নিয়ে আসতে হয়।

বিপ্লবের চিন্তা হলো এতে ই-কমার্স উদ্যোক্তার একটি বড় সময় অহেতুক নষ্ট হয়, দক্ষতাও কমে, আর এই কাজ করার জন্য উদ্যোক্তার নিজে বা মালামাল আনা নেওয়ার জন্য বাড়তি লোক রাখতে হয়। খরচও বেশি হয়ে যায়। এ সমস্যার সমাধান করে ফেললো বিপ্লব – ফোন করলে ই-কুরিয়ারের লোকেরা সেটি উদ্যোগ থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসবে ও কুরিয়ার কোম্পানির কাছে পৌঁছে দেবে।
কিন্তু উদ্যোক্তাদের সবকিছু প্ল্যানমতো হয় না।
কাজে ঐ বড় কুরিয়ার কোম্পানি বেঁকে বসলো। বললো-তাদের কাস্টোমারদের এই ট্র্যাকিং-এর দরকার নেই। তাদের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের বিজনেস কেসেরও বারোটা বেজে গেলে। ভেঞ্চারও সরে গেল।

কী করা যায়? বিপ্লব আসে। আমরা চা-কফি খায় আর ভাবি কী করা যায়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো বিপ্লব নিজে নিজেই ই-কুরিয়ার শুরু করে দেবে। এবং ম্যানেজ সার্ভিস না হয়ে এটা কুরিয়ার সার্ভিসই হবে। মানে নিজেই কুরিয়ার সেবা দেবে। তবে, সাধারণ সেবার বদলে উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠানকে এই সেবা দেবে।

২০১৪ সালে ১৪টা সাইকেল ও ১৪ জন কর্মী নিয়ে শুরু হলো বিপ্লবের ই-কুরিয়ার। তারপর থেকে তাকে আর ই-কুরিয়ার নিয়ে ফিরে তাকাতে হয়নি। কিছুদিন পরই পেয়ে গেল বিনিয়োগও। বাড়লো ব্যপ্তিও।
বিজনেজের জন্য কুরিয়ার সেবার পাশাপাশি ডেটা নিয়ে কাজ, নিত্য নতুন ইনোভেশন নিয়েই এখন চলছে ই-কুরিয়ার। দেশের প্রায় সব মিডিয়াতে বিপ্লব ও তাঁর ই-কুরিয়ার প্রশংসিত হয়েছে।

কুরিয়ার সেবার বিপ্লবের নিজের উদ্ভাবন হলো ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের ওয়্যার হাউস সেবা দেওয়া। না, এটি পার্সেলের গোডাউন নয়। এটি হলো উদ্যোক্তাদের তাদের নিজস্ব প্রোডাক্ট রাখার একটা জায়গা। উদ্যোক্তা ইচ্ছে করলে এ গোডাউনে ঝুড়ি ভাড়া নিতে পারে এবং সেই ঝুড়িতে রাখতে পারে নিজের চালু প্রোডাক্টগুলো। ধরা যাক রাত ৯’টার দিকে কোন একটি ই-কমার্স সাইট একটা অর্ডার পেলো। সেই অর্ডারের সব আইটেম যদি বিপ্লবের গোডাউনে থাকে তাহলে ই-কুরিয়ার টিম নিজেই সেটা ডেলিভারির জন্য রেডি করে ফেলতে পারে এবং পরদিন সকাল সকালই সেটি গ্রাহকের কাছে পৌছে যায়।

২য় সেবাটা উদ্যোক্তাদের গ্রোথ হ্যাকিং-এর সহায়ক। বেশিরভাগ উদ্যোক্তার পক্ষে আলাদা করে কাস্টোমার ডেটাবেস মেইনটেইন করা সম্ভব হয় না। তাদের হয়ে ই-কুরিয়ার এই কাজটাই করে দেয়। একজন উদ্যোক্তা ইচ্ছে করলে কোন এক এলাকার তার গ্রাহকদের বিশেষ সেবা দিতে পারে ই-কুরিয়ারের মাধ্যমে।

বাংলা ভিশনে দেওয়া বিপ্লবের এই সাক্ষাৎকার দেখা যায়

 

ই-কুরিয়ারে এখন ২১৮ জন কর্মী। ঢাকা শহরে ওর ৬টা হাব। আমি গিয়েছিলাম বনানীতে, তাদের হেড কোয়ার্টারে। সব কর্মীর জন্য দুপুরে রান্না করা হয়। পাবদা মাছ, মুরগীর মাংস, সবজি, ডাল আর ভর্তা দিয়ে আমিও সেদিন তাদের সঙ্গে লাঞ্চ করে এসেছি। কর্মীদেরকে ইভিনিং স্ন্যাক্সও দেওয়া হয় কোম্পানির পক্ষ থেকে। সেই ভবনে ওদের দুইটা ফ্লোর। দোতলায় ম্যানেজমেন্ট, কলসেন্টার, এডমিন, একাউন্স।
ঐ ভবনের নিচতলায় ওর এমপিইউ ও এলপিইউ (স্মল (৩ কেজির নিচে) ও লার্জ পার্সেল ইউনিট)। ২৪ ঘন্টা ধরে সেখানে কাজ হয়। ২টি বড় এবং ১০টি ছোট কাভার্ড ভ্যান আছে। লাস্টমাইলে রয়েছে সাইকেলবাহী ডেলিভারি ম্যান। তারা সারাক্ষণই আইটেম পিকআপ করছে, হাবে পৌঁছে দিচ্ছে। হাবে সর্টিং হয়ে যাচ্ছে। কাভার্ডভ্যানে চলে যাচ্ছে হেড কোয়ার্টারে। আবার বেড়িয়ে পড়ছে।
লজিস্টিক পার্টনারদের সহায়তা পার্সেল পৌছে যাচ্ছে ৬০টি জেলায়। ৪৩টি ফ্রেঞ্চাইজি আছে ই-কুরিয়ারের। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারাও এখন হয়ে যাচ্ছেন ই-কুরিয়ারের পার্টনার।

২৫ নভেম্বর থেকে স্বতন্ত্র পার্সেল ডেলিভারি শুরু করবে ই-কুরিয়ার।
আর ১৬ ডিসেম্বর নতুন লোগো নিয়ে হাজির হবে আমাদের বিপ্লব ঘোষ রাহুলের ই-কুরিয়ার।

যার হাত ধরে বদলে গেছে এবং ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের লজিস্টিক সেবার একটি বিশেষ খাত।

বিপ্লব ও তাঁর ই-কুরিয়ারের সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

 

[লিখেছেন – মুনির হাসান]

 

0