সুমন হোসেন ও তার বিসমিল্লাহ স্টোর


নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় মো. সুমন হোসেনের বাড়ি। বাবা-মা আর দুই বোনের সংসার। পরিচিত এক চাচার মাধ্যমে, তার বন্ধুর দোকানে কাজ করার জন্য ঢাকায় আসা। মনোহারি দোকানের মালিক ঐ চাচার বন্ধু তার গ্রামের ছেলেদের দোকানে কাজ করার সুযোগ দেন। থাকা আর খাওয়ার ব্যবস্থাও করেন। আর একটা বেতন।
সুমনও শুরু করে হাতিরপুলের দুইটি দোকানে কাজ। দোকানে কাজ করতে করতে সুমন আবিস্কার করে, মনোহারি দোকানের পূঁজি খুবি বেশি না। বেশিরভাগ পণ্যই সরবরাহকারীরা দিয়ে যায়। পরে এসে টাকা নিয়ে যায়। কাজে সে ভাবলো তারও একটি দোকান হতে পারে। যদি সে একটা দোকান আর দোকানের ভাড়া যোগাড় করতে পারে।
তখন থেকে শুরু হলো টাকা জমানোর কাজ। তার সঙ্গী সাথীরা যখন টাকা খরচে ব্যস্ত থাকে তখন সে টাকা জমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এলিফেন্ট রোড/হাতিরপুল এলাকায় দোকানের ভাড়াতো বটেই, সেলামিও অনেক টাকা। কাজে সে অন্য কিছু ভাবে।
প্রতিদিন রাতে বাসায় ফেরার সময় সে থমকে দাড়াতো জজের গলির মুখে বিসমিল্লাহ স্টোরের সামনে। এটি অতিশয় ছোট একটি দোকান। একটি বাড়ির সিড়ির নীচে। ৫০ বর্গফুটও হবে না।
সুমন ভাবে, এই দোকানটিতো তাঁর হতে পারে। কাজে সে ভাব জমাতে শুরু করে ঐ দোকানদারের সঙ্গে। আর তার সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে এই ব্যবসার খুঁটিনাটিও সে বুঝে ফেলে। কিন্তু উপায় কী?
এর মধ্যে একদিন জানতে পারে, বিসমিল্লাহ স্টোরের মালিক বড় দোকান নিয়েছে এবং সেখানে চলে যাবে। ঐ দোকানঘর তিনি ছেড়ে দেবেন। শোনামাত্রই পড়িমড়ি করে ছুট। বললো- আপনি যদি এই দোকান ছেড়ে  দেন, তাহলে আমাকে চালাতে দিন। আমি চালাই। সবখরচা-খরচ আমার।


এমনিতেই সুমনের আগ্রহ দেখেছেন ঐ মালিক। কাজে তার প্রতি অনেকখানি বায়াসড। শেষে বললেন – এক লক্ষ টাকা দিলে তিনি ঐ দোকান সুমনকে দেবেন। এক লক্ষ টাকা একজন দোকান-কর্মচারীর জন্য অনেক টাকা। কই পাবে?
কয়েকবছর ধরে জমানো টাকার বাক্স ভেঙ্গে ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গেল। মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ায়। এক কাজিনের বর জানতে চাইলে জানালো মাত্র ৫০ হাজার টাকার অভাবে নিজের একটা দোকান হচ্ছে না। সব শুনে টাকা ধার দিতে রাজী হলেন সুমনের দুলাভাই। জমা টাকা আর দুলাভাই-এর টাকা দিয়ে দোকানের পজেশন পেলেন।
কিন্তু মাল তুলবেন কীভাবে?

“তখনই স্যার আমার সম্পর্কটা কাজে লাগলো। আগের স্টোরে থাকার সময় অনেক সাপ্লায়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তারাই এগিয়ে আসলো। তারা সবাই বাকীতে কিছু মাল দিল”।
এভাবে আজ থেকে সাড়ে তিনবছর আগে সুমন হোসেন নিজের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রায় ৫ বছর ধরে আমার সঙ্গে সুমনের পরিচয়। তাঁর এই লড়াই আমি একেবারে কাছে থেকে দেখেছি।
আজ জানালো – সব দেনা শোধ হয়েছে স্যার। আপনাদের দোযায় বিয়েও করেছি বছরখানেক আগে। আপনাকে বিয়ের দাওয়াতও দিয়েছিলাম। আপনি তখন ব্যস্ত ছিলেন।

গল্প করলাম। বাকির কাহিনী শোনালো। গলির মধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবার বাকি নিতে শুরু করে। সারা মাস বাকি নিয়ে পরের মাসের শুরুতে বিল দিতো। কিন্তু দেখা গেল বেশ কিছু পরিবার মাস শেষে বাসা বদল করে চলে গেছে। সুমনের টাকা আর দেয়নি। ‘এরকম ৪০-৫০ হাজার টাকা মার গেছে আমার। যারা টাকা মেরে দিয়েছেন তারা সবাই ভদ্রলোক স্যার। এক এক জনের জন্য ৫-১০ হাজার টাকা কিছু্ই নয়। কিন্তু ৫০ হাজার তো আমার জন্য অনেক’।
এখন আর বাকি দেয় না। বললো- কেউ কেউ মাইন্ড করলেও মেনে নিয়েছে।

এ সাড়ে তিনবছরে সুমন শিখেছে কমিটমেন্ট আর সম্পর্কের দাম। বললো- ‘আমি নিয়মিত সাপ্লায়ারদের টাকা পরিশোধ করি। সেজন্য সবাই আমাকে বাড়তি মাল দেয়। কোম্পানির প্রমোশনাল কিছু থাকলে শুরুতে আমাকে দিযে যায়’।
আজ সকালেও দুটো তেল কোম্পানি ৩০ হাজার টাকর মাল দিয়ে গেছে।

সুমনের শখ একদিন তার দোকানটা বড় হবে। এখন থেকে সে প্রস্তুতিই নিচ্ছে।

সুমনের মতো হাজারো উদ্যোক্তার স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

উদ্যোক্তাদের জন্য শুভ কামনা।

[লিখেছেন মুনির হাসান]

 

0