সামিয়া-নবনীতার গ্রাম্পি ফিশ – মাছ নয়, টি-শার্টে ভালবাসা


গ্রাম্পি ফিশ নাম শুনে মাছের কারবার মনে হয়। এবারের উদ্যোক্তা সম্মাননা ২০১৭ এর সময় আমি প্রথম তাদের নাম শুনি। “মাছের কারবারী?”
না, আমার প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে কুটি কুটি। কারণ এটি আসলে টি-শার্টের একটি উদ্যোগ। উদ্যোক্তাদের ভাষায় “ত্যানার কারবারী!!!”
হ্যা, অনেকেই সামিয়া বিনতে আলমগীর আর নবনীতার উদ্যোগকে ত্যানা বিক্রির ব্যবসা বলে। তাতে ওরা মাইন্ড করে না। সদা হাস্যজ্বল আর অফুরাণ প্রাণশক্তির এই দুই উদ্যমী উদ্যোক্তার সঙ্গে গল্প করতে করতে আমার মনে হলো “আরে, ওরা তো মাইন্ডই করতে পারে না”।
ধানমন্ডির ইন হাউসে তিনটে কিউবিকল নিয়ে ওদের অফিস। মিরপুরে আর কাটাবনে কারখানা। সেখানেই শুনছিলাম ওদের শুরুর গল্প।

“পকেট মানির জন্য ২০১৫ সালে আমরা দুইজন এটা শুরু করি। মজা করেই গ্রাম্পি ফিশ নামটা দেওয়া”। ঐ সময়টাতে বাসা থেকে পকেট মানি নিতে কেমন জানি লাগতো্সেটা ম্যানেজ করার জন্যই এই চেষ্টা। অন্যদের মতো টিউশনি করতে মন চায়নি। “এমন কিছু করতে চাই, যা কেবল পকেট মানি যোগাবে না। বরং ভালবাসাটাও টের পাওয়া যাবে”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা শিক্ষা পড়ার কারণে ততোদিন বিশ্বখ্যাত সব উদ্যোক্তার কথা জানা হয়ে গেছে। অ্যামাজন ডট কমের জেফ বেজোস, এপলের স্টিভ জবস , আলীবাবা ডট কমের জ্যাক মাসহ বিখ্যাত এন্ট্রাপ্রিনিয়রদের সফল গাঁথা। কাজে নিজেদের একটা ভালবাসার শুরু।
শুরুর দিনটা সামিয়া বলছিল এভাবে- “আপনি যদি বিজনেস স্টুডেন্ট হন, আপনাকে ঘুরে ফিরে একটা বিষয়ের ওপরেই গুরুত্ব দিতে শেখানো হবে, আর তা হলো – মানুষ । বিজনেসের ভাষায় কাস্টমার বা ক্লায়েন্ট। আমাদের গ্রাম্পি ফিশের ক্লায়েন্ট কিন্তু আমরাই। মানে আমাদের মতো কলেজ ইউনিভারসিটিতে যাওয়া ছেলেমেয়েরা । আমরা আমাদের পোশাকে, টিশার্টে, হুডিতে, জ্যাকেটে নিজেদের ব্যক্তিত্ব ,পছন্দ-অপছন্দ ফুটিয়ে তোলার জন্য যা খুঁজি, গ্রাম্পি ফিশে আপনি সেসবই পাবেন”।
কাজে ডিজাইনটা কঠিন ছিল না। কারণ কাস্টোমারদের চয়েস তো জানাই আছে।  অঞ্জন দত্ত, তিন গোয়েন্দা, সত্যজিত রায়, ফেলুদা, মহীনের ঘোড়াগুলি, হ্যারি পটার – এসবই থাকতে হবে। শুধু যে তারা থাকে তা নয়। সামিয়া আর নবনীতা বের করে ফেলেছে সেই চরিত্রগুলো দিয়ে কীভাবে গল্প বানাতে হয়।

কাজে তাদের কোন টি-শার্টে আপনি কেবল ফেলুদা, জটায়ুকে দেখবেন না, তাদের সঙ্গে পেয়ে যাবেন তাদের লেখক সত্যজিৎ রায়কেও। ক’দিন আগের চট্টগ্রামের ট্যাগ লাইন “বদ্দা কেনে চলর” দিয়ে বানানো দুইটি টি-শার্ট আমাকে ওরা পাঠিয়ে ছিল। আমার মাপে মিলে নাই কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সেটি হাইজ্যাক হয়ে গেছে আমার ছেলে-মেয়ের দ্বারা! ওরা আর আমাকে ছবি তোলার জন্যও ফেরৎ দেয়নি।
শুরুতে যতোটা সোজা ছিল এন আর ততোটা নেই। কারণ “সবাই নতুন কিছু খুঁজে। নতুন ফিউশন দরকার। এসবই ভাবতে হয়। আবার মার্কেটে কম্পিটিটিরও আছে। সব মিলিয়ে আমরা চ্যালেঞ্জটা উপভোগ করছি”।

সামিয়ার বাড়িতে “ত্যানা বিক্রি” করা নিয়ে শুরু দিকে একটু ঝামেলা থাকলেও এখন আর নেই। “উদ্যোক্তা সম্মাননা অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর বাবা অনেক বদলে গেছেন। এখন উৎসাহও দেন”। সামিয়া জানালো। নবনীতার অবশ্য পারিবারিক ঝামেলা ছিল না।

আর তাই গ্রাম্পি ফিশ এখন আর ‘পকেট মানি” প্রতিষ্ঠান নেই। প্রায় আট জন মানুষ কাজ করে গ্রাম্পি ফিশে। এর মধ্যেই এফ-কমার্সের গন্ডি ছাড়িয়ে গ্রাম্পি ফিশ যাত্রা করেছে টিশার্টের ই- কমার্স প্ল্যাটফরম হিসেবেও। ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর কথাও ভাবছে সামিয়া-নবনীতা। সেটি নিয়ে চলছে এখন গবেষণা।
ওদের স্বপ্ন গ্রাম্পিফিশকে বহুদূর নিয়ে যাওয়ার।
ওদের স্বপ্ন পূরণ হোক।

গ্রাম্পি ফিশের অনলাইন স্টোর
ফেসবুক পেজ 

[লিখেছেন – মুনির হাসান]

0