উদ্যোগে অগ্রগামী, উচ্ছ্বাসে একত্রে


বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে কর্মবাজারে আসে। এদের একটা বড় অংশ বিদেশে চলে যায়, খুবই কম সংখ্যকের বিসিএস হয়, অনেকের বেসরকারি চাকরি হয়। হরেদরে শেষ পর্যন্ত ১০-১২ লাখের একটা গতি হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ১০ লাখ লোকের কোন গতি হয় না। এদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বলা হয়, দেশের ৪৭% শিক্ষিতের কোন কাজ নেই!

এ সমস্যা আমাদের দেশের জন্য নতুন হলেও অন্য অনেক দেশই এ সমস্যার সমাধান করেছে। যেমন চীন। চীনে ১৯৭৭-৭৮ সালে বেবি বুম হলো। তখন তারা হিসাব করে দেখলো ১৯৯৯ সাল থেকে এই বিরাটসংখ্যক ছেলেমেয়ে কর্মবাজারে এসে পড়বে। তাদের কিভাবে কাজ দেওয়া যাবে?

কেবল সরকারি উদ্যোগে তাদের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে না। চীন তখন তাদের ব্যবসার ইকো সিস্টেমকে ঠিক করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থাপন করেছে ইনকিউবেশন সেন্টার। শিক্ষার মৌলিক পরিবর্তন করে সমস্যা সমাধানে আগ্রহীদের খুঁজে বের করেছে। ফলে, তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। ফলস্বরূপ, এখন চীনে প্রতিদিন ৫ জন কোটিপতির জন্ম হয়!!!

কিন্তু, কাজ করতে গিয়ে আমরা টের পেলাম আমাদের দেশে ব্যবসা উদ্যোগকে মোটেই ভাল চোখে দেখা হয় না। খারাপ কাজের সঙ্গে বাণিজ্য কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীর বিয়ের বাজার ভাল, কিন্তু উদ্যোক্তাকে কেউ মেয়ে বিয়ে দিতে চায় না। অথচ ছোটবেলা থেকে আমরা শুনি ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’!

এরকম একটি বাস্তবতায় ২০১১ সালের গণিত অলিম্পিয়াড থেকে আমরা উদ্যোগ আর উদ্যোক্তা নিয়ে কাজ শুরু করি। সেবার গণিত অলিম্পিয়াডের প্রতি পর্বে হাজির হন একজন উদ্যোক্তা। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা শোনান সবাইকে। ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম আলো পত্রিকার স্বপ্ন নিয়ে পাতায় আমি একটা নিবন্ধ লিখি। অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ আর স্বপ্ন নিয়ে’র সেই সময়কার সম্পাদক ফিরোজ জামান চৌধুরীর কাটাকাটিতে সেটির শিরোনাম হয় ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’। তার ৬ দিন পর ১৩ এপ্রিল আমি ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলি, একই নামে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) থেকে এন্ট্রাপ্রিনিয়রশিপ নিয়ে আলাপ আলোচনা করা। সেটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। এটিই আমাদের প্ল্যাটফর্মÑ চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব। উদ্দেশ্য বহুমুখী-

  • তরুণ-তরুণীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সন্ধান দেওয়া, উদাহরণ, সাফল্য তুলে ধরে তাদের উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত ও সাহায্য করা
  • উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, তত্ত্ব, প্রশিক্ষণ ও বাজার সহযোগিতা প্রদান
  • পুঁজি জোগাড়ে সাহায্য করা
  • তাদের পথ চলাকে উৎসাহিত করার জন্য সম্মাননা দেওয়া ইত্যাদি।

সেই থেকে বিগত বছরসমূহে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে এই প্ল্যাটফর্ম। শুরুর দিকে কেবল ফেসবুক গ্রুপে (https://www.facebook.com/groups/uddokta/) অনলাইন মেন্টরিং-এর মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও পর্যায়ক্রমে অফলাইনেও এর কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে অনলাইন অফলাইনের মেন্টরিং ছাড়াও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মশালা, সেমিনার ও বুটক্যাম্পের আয়োজন, উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আড্ডা ও পাঠচক্র, তাদের পণ্য ও সেবা সকলের কাছে তুলে ধরার জন্য উদ্যোক্তা হাট প্রভৃতির আয়োজন করা হয়। এছাড়া উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি কার্যক্রমের জন্য তৈরি করা, আইন ও ঋণসুবিধা প্রাপ্তির জন্য সহায়তা করার কাজও রয়েছে। রয়েছে তাদেরকে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত করার কাজ। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে বিগত বছরের সফল উদ্যোক্তাদের সম্মাননা ও স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিশেষ সম্মাননা- নুরুল কাদের সম্মাননা ও ইউসুফ চৌধুরী সম্মাননা। নুরুল কাদের সম্মাননা দেওয়া হয় যিনি দেশে নতুন ঘরানার কাজ সৃষ্টি করেছেন। এ পর্যন্ত চার জন এই সম্মাননা পেয়েছেন। এদের একজন গ্রামীণ-ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজমের সূচনা করেছেন, একজনের প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বের এক নম্বর জুমলা ভিত্তিক কোম্পানি, অন্য একটির তৈরি সফটওয়্যার বিশ্বের ২০টি ভাষাতে অনূদিত হয়েছে। আর সব শেষের জনের হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দেশের প্রথম রিপারেটরি ড্যান্স থিয়েটার। অন্যদিকে অধ্যবসায়, নিষ্ঠা দিয়ে প্রথাগত উদ্যোগকে উচ্চ মাত্রায় নেওয়ার জন্য ইউছুফ চৌধুরী সম্মাননা পেয়েছেন একজন প্লাস্টিক কারখানার উদ্যোক্তা, বিশ্বের প্রথম সারির ব্যান্ডের জুতা তৈরির উদ্যোক্তা ও চেইন ফুড শপের উদ্যোক্তা।

চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব -এর ট্যাগ লাইন হলো- পথে নামলেই কেবল পথ চেনা যায়। বর্তমানে এ প্ল্যাটফর্মের ফেসবুক গ্রুপে ৮০ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েক হাজার এরই মধ্যে নিজেদের উদ্যোগে নেমে পড়েছেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এ কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন। দেশে একটি উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এই গ্রুপের সদস্যরা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন।

তবে, কাজের তো শেষ নেই। সেই ভাবনার ফসল এই দুই দিনের আয়োজন আইপিডিসি উদ্যোক্তা সামিট। এখানে আমাদের তরুণ ও নবীন উদ্যোক্তারা যেমন থাকবেন, তেমনি সিনিয়র ও পোড় খাওয়া উদ্যোক্তারাও থাকবেন। তাদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হবে। থাকবে ইকোসিস্টেম নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব। থাকছে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মেলবন্ধনের ব্যবস্থা। প্রোডাক্ট শো-কেসিং এর সুযোগ। এদের মধ্যে যারা একটু অগ্রগামী তাদের জন্য ফেব্রিকেটেড স্টল। আর যারা একেবারে নতুন তাদের জন্য টেবিল স্টল। রয়েছে সমঝোতা বা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা। সেশন ও কর্মশালাগুলোতে হাজির থাকবেন বরেণ্য শিল্পপতি, সফল উদ্যোক্তা, ভেঞ্চার বিনিয়োগকারী, ব্যাংকার, শিক্ষাবিদসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ।

এই আয়োজনটি সম্ভব হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) বিশেষ সহযোগিতায়। ইউএপি এ আয়োজনের যৌথ আয়োজক। আমাদের টাইটেল স্পন্সর আইপিডিসি ফাইন্যান্স আমাদের বড় আয়োজনের স্বপ্ন দেখিয়েছে। আমাদের স্পন্সর ক্রিয়েটিভ আইটি, ওয়ালেটমিক্স, এম্বার আইটি, ইগলু আইসক্রিম ও বারকোড রেস্তোরাঁ গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, একসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্প এবং ইও বাংলাদেশ আমাদের কৌশলগত সহায়তা দিয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার রয়েছে সহযোগী হিসাবে। এছাড়া আমাদের সকল পার্টনার, লোগোবোর্ড স্পন্সর, গিফট পার্টনারদের আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এ আয়োজন আমাদের উদ্যোক্তাদের সামনে আরও একধাপ এগিয়ে দেবে।

মুনির হাসান: আহ্বায়ক, আইপিডিসি উদ্যোক্তা সামিট ২০১৮ এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক।

0