ট্যান, ট্যানারি ও আমাদের তানিয়ার গল্প


হাজারীবাগ বে ট্যানারির থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলে একটি অদ্ভুত বিল্ডিং আছে। এর তিনতলায় ওঠাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ সিড়ি পরিবর্তন করেই তবেই ওঠা। বিরাট উদ্যম নিয়ে সে বিল্ডিং-এর তিন তলায় উঠলে তবে আপনি দেখা পাবেন ‘কারিগর’-এর। মোট তিনটি রুম নিয়ে উদ্যোক্তা তানিয়া ওয়াহাবের কারিগর।

ফ্যাক্টরিতে নিজের আসনে

চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, বিশেষ করে গিফট আইটেম তৈরি করেন তিনি। দেশেতো বটেই ওয়ালেট বানিয়ে দিয়েছেন এমিরেটসের সুলতানদের উপহারের জন্য, পাঠিয়েছেন অন্য অনেক দেশেও। এরই মধ্যে পেয়েছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের সেরা এসএমই নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার (২০০৮), এফবিসিসিআইয়ের সেরা এসএমই নারী উদ্যোক্তা (২০১১) এবং ডেইলি স্টার-ডিএইচএলের আউটস্ট্যান্ডিং ওম্যান ইন বিজনেস (২০১৩) পুরস্কার। কারিগরের ওনার টেবিলের পাশেই সাজানো আছে সে পুরস্কারগুলো।

তানিয়ার প্রথম মেশিন

ছোটবেলা থেকে স্বাধীনচেতা তানিয়া সব সময় ভেবেছেন নিজেই সৃজনশীল কিছু করবেন, কারও অধীনে চাকরি করবেন না, বরং অন্যদের চাকরি দেবেন। ঢাকার লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হওয়ার পরপরই সুযোগটা তিনি কাজে লাগান। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের কাপড় খুঁজে এনে নিজের ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে হলের মেয়েদের কাছে বিক্রি করা শুরু করেন। ঈদের সময় কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্রও করেছেন। নিজের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর জন্য শুরু করেন দুই-দুইটি গৃহশিক্ষকতার কাজ। মৌসুমি কাপড় ডিজাইনের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের ক্যানটিনে প্রতিদিন নুডলস আর পুডিং সরবরাহ করাও শুরু হয়।
‘সকাল থেকে ক্লাস করে, বিকেলে দুটি টিউশনি করে হলে ফিরতে আমার প্রায়ই রাত হয়ে যেত। তারপর পরের দিনের নুডলস আর পুডিংয়ের সবকিছু ঠিক করে, পড়াশোনা শেষ করে যখন ঘুমোতে যেতাম, তখন হয়ে যেত গভীর রাত, কখনো কখনো সকাল! সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পুডিং আর নুডলস রেডি করে ক্যানটিনে পৌঁছে দিয়ে তারপর আবার ক্লাস।’ বলেন তানিয়া। জানালেন, হলের নির্মাণকাজের সময় কখনো কখনো বারান্দায় রাত কাটাতে হতো!
‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো পোশাক বা খাবার কোনোটাতে থাকলেন না। কেন?’ জানতে চাইলাম।
‘কারণ, চামড়া নিয়ে পড়তে পড়তে সেটার “প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম”।’ হাসলেন তানিয়া। জানালেন, ব্যবহারিক ক্লাসগুলোতেই পড়ে থাকতেন সারা দিন। নানা রকম ডিজাইনের ব্যাগ, স্যান্ডেল, বাহারি জুতা, মানিব্যাগ, পার্স ডিজাইন করে সেটা বানাতেই ভালো লাগত তাঁর। সেই সঙ্গে শুরু হলো হাজারীবাগ আর বংশালের ছোট ছোট চামড়ার ফ্যাক্টরিতে ঢুঁ মারা। উদ্দেশ্য দুটো—কে কোন জিনিস ভালো বানায়, সেটা জানা; আর এই ব্যবসার অন্ধিসন্ধি জানা। কোনো কোনো ফ্যাক্টরিতে ঢুকতেই পারতেন না। কিন্তু হাল ছাড়েননি।
তবে, মনে একটা খটকা ছিল। কারণ, চামড়াজাত পণ্য নিয়ে কাজ করছেন, এমন কোনো সফল নারীর উদাহরণ তাঁর সামনে ছিল না। শেষমেশ ভাবলেন, ‘উদাহরণ বরং আমাকে দিয়েই শুরু হোক।’
টিউশনির জমানো ১০ হাজার টাকা দিয়ে হাজারীবাগে শুরু করলেন নিজের ‘এথিনি’ নামে একটি ১০০ বর্গফুটের দোকান কাম ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি মানে একটি সিঙ্গার সেলাই মেশিনকে এদিক-ওদিক করে লেদারের জন্য উপযোগী করা। তখনো গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়নি। চামড়ার জ্যাকেট, জুতা, মানিব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি কখনো নিজে আবার কখনো কাউকে দিয়ে বানিয়ে নেওয়া। এর মধ্যে দেখলেন দেশের করপোরেট গিফট আইটেমের বিশাল বাজার আর তার পুরো নিয়ন্ত্রণই বিদেশ থেকে আসা পণ্যের দখলে।
‘পৃথিবীর অন্য অনেক দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো গিফটের সময় স্থানীয় পণ্যকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে তার দেখা মেলে না।’ তাই সেই বাজারে ঢোকার সাহস করলেন।
শুরুতে অন্যদের অর্ডারে পণ্য সরবরাহ। সমস্যা হলো অন্য খানে। কোনো কোনো সময় এসব কাজের সময় পাওয়া যেত খুবই কম। কারখানায় থাকতে হবে রাতে। কিন্তু তানিয়া কেমন করে রাতে কারখানায় থাকবেন? আবার কাজও বেড়ে গেছে, দুই হাতে সব সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। কাজেই ব্যবসাকে বড় করার জন্য এথিনিকে ছেড়ে ইনস্টিটিউটেরই জুনিয়র শিক্ষার্থী সুমন কুণ্ডুকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন নতুন প্রতিষ্ঠান কারিগর। তানিয়া তার ম্যানেজিং পার্টনার। তার পর থেকে তানিয়াকে আর পেছনে তাকাতে হচ্ছে না।
বাংলাদেশ বিমানের নিরীক্ষা কর্মকর্তা প্রয়াত আবদুল ওয়াহাব আর গৃহিণী সাজেদা ওয়াহাবের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় তানিয়া। ১৯৯৬ সালে এসএসসি ও ১৯৯৮ সালে এইচএসসি। তারপর সেশনজটের পাল্লায় পড়ে লেদার টেকনোলজিতে বিএসসি পাস ২০০৬ সালে।
২০০৮ সালে আরও একটি ঘটনা ঘটে, যা তানিয়াকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। সে বছর ইতালির বিখ্যাত ডিজাইনার বারবারা গার্দুসি ঢাকায় এসে প্রায় ছয় মাস অবস্থান করেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিংয়ের একটি প্রকল্পে। ১১ জন ডিজাইনারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ তানিয়ারও সুযোগ হয় বারবারার সঙ্গে কাজ করার ও শেখার। তত দিনে লেদারশিল্পে নিজেই একটা উদাহরণ হয়ে গেছেন তানিয়া। শুরু করলেন অন্যদের পথ দেখানো। নতুনদের সহযোগিতা করতে গঠিত হলো ‘লেদার টেকনোলজিস্ট স্মল এন্ট্রােপ্রনিউরস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’। ১০ জন মিলে গড়ে তোলা সম্মিলিত ব্র্যান্ড ‘লেদার কেইভ’। নিজের প্রতিষ্ঠানে লেজারের দুইটি মেশিনও এনেছেন তানিয়া। তবে, সেখানে কেবল নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজ করেন না। যে সব প্রতিষ্ঠানের লেজার মেশিন নেই তারাও সেখানে থেকে কাজ করিয়ে নিতে পারেন। এখন সেখানে কাজ করেন ৩০-৩৫ জন কর্মী।

নিজে যে কঠিন পথে হেটেছেন, জুনিয়রদের জন্য সেটা মসৃণ করতে চান। প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া থেকে, সেসব দেশের সরকারের বৃত্তি নিয়ে। এখন সেগুলোই অন্যদের শিখিয়ে দিচ্ছেন। চেষ্টা করছেন তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে। ডিবিসি টেলিভিশনের নিয়মিত আয়োজন “সমাধান সূত্রে” তাই প্রায়শ হাজির থাকেন। হাজির থাকেন এমএসই ফাউন্ডেশন, চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব কিংবা সেরকম নানা প্ল্যাটফর্মের অনুষ্ঠানে। চ্যালেঞ্চ অবশ্য পিছু ছাড়ছে না। সবচেয়ে বেশি ঠেকেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহকৃত পণ্যের বিল আদায়ে। জানালেন একটি বহুজাতিক কোম্পানির বিল পেতে কখনো কখনো ৫-৬ মাস সময়ও লেগে যায়।

‘কারিগর’এর পাশাপাশি নিজের ভিন্ন কিছু চিন্তাকে তুলে ধরার জন্য তৈরি করেছেন ‘ট্যান” নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানেও রয়েছে নতুনত্ব ও আভিজাত্যের ছোঁয়া।

তানিয়া ভাবেন, তাঁদের কাজের মাধ্যমে একসময় করপোরেট গিফট আইটেমের বাজারটা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের দখলে আসবে, গুণে ও মানে। এরই মধ্যে অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হয়ে উঠেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাজের ব্যাপারে।

তানিয়ার মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরে পূরণ হোক আমাদের প্রত্যাশা।

0